শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ১২:৫১ অপরাহ্ন

সর্বশেষ সংবাদ

আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসীর পরামর্শেই দেশে ফিরেন মামুন!

মোঃ আনোয়ার হোসেন॥

মিরপুর এলাকার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসীর পরামর্শেই দেশে ফিরেন শীর্ষ সন্ত্রাসী মফিজুর রহমান মামুন। তারা তিন ভাই মিলে ভারতে বসেই মিরপুর-পল্লবী এলাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরোটা নিজেদের কব্জায় নেয়ার পরিকল্পনা করেছেন, এ বিষয়টি আঁচ করেই তাকে দেশে ফিরে একটি কিলিং মিশনের পরামর্শ দেন। কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে উল্টো ‘লেদার লিটনের’ মধ্যস্থতায় তাদের তিন ভাইয়ের সঙ্গে কয়েক দফা নেপালে বৈঠকও করে। বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে মামুনের জন্য কয়েকটি কাজে ফোনও দেয় ওই সন্ত্রাসী। সর্বশেষ ওই শীর্ষ সন্ত্রাসীর পরামর্শেই মামুন ঢাকায় আসে এক রাজনৈতিক নেতাকে কিলিংয়ের মিশন নিয়ে। কেউ কেউ বলছেন, ওই সন্ত্রাসীর ফাঁদে পা দেয়াই কাল হয়েছে মামুনের জন্য। গ্রেফতার হয়ে মামুন এখন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) কব্জায়। ৪ দিনের রিমান্ডের গতকাল অতিবাহিত হয়েছে প্রথম দিন।
সূত্র বলছে, মামুনের আপন বড় ভাই মজিবর রহমান জামিল। ছোট ভাই মশিউর রহমান মশু গাজীপুরের সাবেক সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ হত্যা মামলার ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। জামিলের নামে ৫টি হত্যাসহ ১৭টি মামলা রয়েছে। মামুনের বিরুদ্ধে রাজধানীর একাধিক থানায় হত্যা, মাদকসহ ২৭টি মামলা ও জিডি রয়েছে বলে পুলিশের ভাষ্য। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৬ টি। তিনটি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন জীবন সাজাপ্রাপ্ত মামুন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৪ সালে ভারতে পালিয়ে যাবার পর ত্রিপুরায় ক্ষমতাসীন এক এমএলএ’র ভাইয়ের আশ্রয়ে ছিলেন বেশ কিছুদিন। ওই ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে মামুনের। ওই বাড়ীতে দীর্ঘদিন আশ্রয়ে থাকার কারনে ওই ব্যক্তির বোনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে মামুনের। একপর্যায়ে গোপনে তারা বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। ভারতীয় পরিচয় নিয়ে একটি পাসপোর্টও তৈরি করে। ওই পাসপোর্ট দিয়ে সে নিয়মিত ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও নেপাল ভ্রমণ করেছে। তবে কিছুদিন পর বিয়ের বিষয়টি আঁচ করতে পারার পর মামুনকে অবৈধ অনুপ্রবেশসহ আরেকটি অপরাধের সংশ্লিষ্টতা দেখিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়। পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেল অবস্থান করলেও মামুন তার ভাইদের মাধ্যমে ঢাকায় অপরাধ কর্মকান্ড অব্যাহত রাখেন। মোবাইল ফোনে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন পেশার মানুষের কাছে চাঁদা চেয়ে হুমকি দিতেন। প্রাণ বাঁচাতে ব্যবসায়ী, বাড়ির মালিক, কাউন্সিলর, এমনকি মাদককারবারিরও তার লোকদের হাতে চাঁদা তুলে দিতেন। অন্যথায় টার্গেট ব্যক্তিকে খুন করিয়ে ফেলতেন মামুন। ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের জেল থেকে মুক্ত হয়ে তার সেই আশ্রয়দাতা বন্ধুকেই খুন করেন। পালিয়ে যান নেপাল। আশ্রয় নেন ধানমন্ডি-হাজারীবাগ এলাকার পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী লেদার লিটনের কাছে।
যেভাবে উত্থান:
এক সময়ের ফেন্সিডিলের স্বর্গ হিসেবে চিহ্নিত ছিলো পল্লবীর ধ-ব্লক ও সাংবাদিক কলোনি এলাকা। এখানকার মাদক সিন্ডিকেটর অন্যতম সদস্য ছিলেন মামুন। মিরপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইব্রাহিম, সাহাদাত, তাজগীরের রামরাজত্বের মধ্যেই নাটকীয় উত্থান ঘটে মামুনের। মিরপুরের পল্লবী থানাধীন ধ-ব্লকের বাসিন্দা মামুন ১৯৯৫ সালেও ছিঁচকে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ছিলেন এলাকায়। শীর্ষ সন্ত্রাসী হয়ে ওঠার নাটকীয় ঘটনাটি ঘটে ২০০২ সালে। সে সময় পুলিশের হাতে আটক এক মাদককারবারিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় পল্লবী থানায় সশস্ত্র হামলা চালান মামুন ও তার বাহিনী। প্রায় ২ ঘণ্টা বন্দুকযুদ্ধের পর অস্ত্রসহ ধরা পড়েন মামুন। দু’পক্ষের গোলাগুলিতে আহত হন তার এক সহযোগী। বছরখানেক কারাভোগের পর বিএনপির কেন্দ্রীয় এক নেতার যোগসাজশে একদিনে সাতটি মামলায় জামিন নিয়ে ২০০৪ সালে তিনি পাড়ি জমান ভারতে। চাঁদা না পেয়ে ২০০৮ সালে পল্লবীতে নজরুল ইসলাম চৌধুরী মন্টু নামে এক ঝুট ব্যবসায়ীকে খুন করার মামলায় অন্যতম আসামি মামুন। ২০১২ সালে তার বাহিনীর হাতে খুন হন গার্মেন্টস কাপড় ব্যবসায়ী রমজান। এ হত্যা মামলায় মামুনকে প্রধান আসামি হিসেবে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ। শুধু তা-ই নয়, ১৯৯৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মামুনের বিরুদ্ধে পল্লবী ও মোহাম্মদপুর থানায় হত্যা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে ২৭টি মামলা হয়।
সন্ত্রাসী মামুন ও তার বাহিনী সর্বশেষ আলোচনায় আসেন পল্লবী-১২ নম্বর সেকশনের বি-ব্লকে ৯/২ নম্বর সড়কের ১৫২/১৬ নম্বর বাড়িটি দখলের মধ্য দিয়ে। এ নিয়ে গত বছরের ২১ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন পল্লবীর ভুক্তভোগীরা। তারা জানান, মো. সোহাগ নামে একজনের একটি বাড়ি কিনবেন বলে তাকে অল্প কিছু টাকা দিয়ে বায়না করেন মামুনের অন্যতম এক সহযোগী। পরে রাতের আঁধারে সন্ত্রাসী মামুন ও জামিলের বাহিনী ওই বাড়িটি দখল করে নেয়। এরও কিছুদিন আগে পল্লবী থানার কম্পাউন্ডে রহস্যজনক বোমা বিস্ফোরণের কান্ডে আলোচিত হয়ে ওঠেন মামুন। গত বছরের ২৯ জুলাই ভোরের ওই ঘটনায় চার পুলিশসহ পাঁচজন আহত হন। এর পর পল্লবীতে অস্ত্রসহ তিন যুবককে গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসে মামুনের সংশ্লিষ্টতার চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
জানা গেছে, বর্তমানে মামুনের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে এলাকায় গোপনে সক্রিয় মাসুদ। মূলত: ইয়াবা ব্যবসার দেখভাল করছে মাসুদ। ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে তার অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করে কিবরিয়া, মাইজ্যা দুলাল। লরেন ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। মিরপুর এলাকায় তার অন্তত: কয়েক ডজন সহযোগী রয়েছে। চাঁদার টাকা তুলে তারাই মামুনের কাছে পাঠাতো। গত বছর পল্লবী এলাকার দুই রাজনৈতিক নেতাকে হত্যার জন্য ভাড়ায় খাটছিলেন গ্রেফতার রফিকুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম ও মোশাররফ হোসেন। তাদের প্রত্যেকেই মামুন-জামিলের অন্যতম ক্যাডার।
সিটিটিসি’র উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম বলেন, পল্লবী থানা কম্পাউন্ডে হামলার সম্পর্কে জঙ্গিরা দাবী করার পর থেকেই আমরা কাজ অব্যাহত রাখি। রাষ্ট্রবিরোধী একটি সন্ত্রাসী চক্র টার্গেট কিলিং ও ব্যাপক সহিংসতা সৃষ্টির মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল

Print Friendly, PDF & Email

Please Share This Post in Your Social Media

কপিরাইটঃ ২০১৬ দৈনিক অন্যদিগন্ত এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Design & Developed BY It Host Seba  
Shares