বৃহস্পতিবার, ০৪ মার্চ ২০২১, ১২:০৮ অপরাহ্ন

উত্তরায় সেনাবাহিনীতে চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারনার অভিযোগে গ্রেফতার নয়

যোবায়ের আহমাদ ।।

সেনাবাহিনীতে চাকরি দেওয়ার নাম করে মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে একজন ডাক্তার ও একজন ছাত্রলীগ নেতাসহ নয়জনকে আটক করেছে র‍্যাব-১। উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরের ৩ নম্বর সড়কের ৮ নম্বর বাড়ির দারুল আকরাম মডেল মাদরাসার চতুর্থ তলার আটক ডাক্তারের চেম্বার থেকে রোববার (৩১ জানুয়ারি) বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। এ সময় তাদের হেফাজত থেকে অন্তত ২০ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয়েছে।

আটককৃতরা হলেন, উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ডা. মেজর (অব.) আকেল মোহাম্মদ, উত্তরা পশ্চিম থানা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আফজালুর হক হিমেল (৩০), আলাল মিয়া (৩২), সিরাজুল ইসলাম (২৩), লিটন সরকার (৪০), আমিনুল ইসলাম (৪১), মিজানুর রহমান (৩৫), মো. আজিজ (৩৫) ও সুলতান (৩৩)।

অভিযানকালে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই) সদস্যরা। সকাল থেকেই তারা ঘটনাস্থলটি রেকি করছিল বলে জানানা তারা।

উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগীরা সারাক্ষণকে জানান, ‘দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে চাকরিপ্রার্থী অসহায় ও গরিব মানুষকে সেনাবাহিনীতে চাকরি দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আটককৃতরা জনপ্রতি ৫/৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। নানান কৌশলে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর ভুক্তভোগীদের মেডিকেল পরীক্ষার জন্য ডাক্তারের চেম্বারে নিয়ে আসা হতো। পরবর্তীতে ডাক্তার আক্কেল মুহাম্মদ সবার নাকের পলিপাস অপারেশন করাতেন।’

তারা আরো বলেন, আটক হওয়া প্রতারক চক্রটি সেনাবাহিনীতে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর লাপাত্তা হয়ে যান। পরবর্তীতে সেনাবাহিনীতে চাকরি না দিতে পারার কারণে টাকা চাইতে গেলেই বিভিন্ন মাধ্যমে দেওয়া হতো হুমকি-ধামকি।

তারা আরো বলেন, আটককৃত প্রতারকরা নানান কৌশলে টাকা হাতিয়ে নিতো। একবার বলতো মেডিকেল পরীক্ষা করানোর জন্য টাকা লাগবে। আবার বলে মেজর স্যারকে ম্যানেজ করার জন্য টাকা দিতে হবে। এইভাবে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৫ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিতো চক্রটি।

সরোজমিনে ঘটনাস্থলের ওই চেম্বারে গিয়ে দেখা যায়, চেম্বারে মধ্যেই রয়েছে অপারেশন থিয়েটার। ডাক্তার মেজর (অব.) আকেল মুহাম্মদ চাকরিপ্রার্থীদের তিনি ও তার চেম্বারে থাকা দুই জন অর্ধ শিক্ষিতদের দিয়ে করাতেন অপারেশনের কাজ। তারা হলেন, ঝাড়ুদার সুলতান ও পাহারাদার আজিজ।

অভিযানকালে ঘটনাস্থলে থাকা ভুক্তভোগী আব্দুর রহমান জানান, তিনি বরিশাল জেলার হিজলা উপজেলা চর মেমানিয়া এলাকা থেকে সেনাবাহিনীতে চাকরি করার উদ্দেশ্যে ঢাকায় এসেছেন। তিনি সারাক্ষণকে বলেন, ‘আটক হওয়া ওই প্রতারক চক্রের সদস্যরা সেনাবাহিনীতে চাকরি দেওয়ার কথা বলে আমার কাছ থেকে নানান কৌশলে, নানান অজুহাত দেখিয়ে ৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর তারা ঘা ডাকা দেন।’

তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনীতে চাকরি করার জন্য কেউ আসলেই প্রতারক চক্রের সদস্যরা এই ডাক্তারের চেম্বারে নিয়ে আসতো। পরবর্তীতে মেডিকেল পরীক্ষার নামে নাকের পলিপাস অপারেশনের নাম করে হাতিয়ে নিতো ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা।’

এদিকে একই উপজেলার খাগের চর নামক গ্রামের জাহিদ হাসান সারাক্ষণকে বলেন, ‘এই চক্রটি আমাকে সেনাবাহিনীতে চাকরি দেওয়ার নাম করে ইতিমধ্যে ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আজ মেডিকেল পরীক্ষার কথা বলে এখানে নিয়ে এসেছে। মেডিকেল পরীক্ষার জন্য দাবি করা হয়েছে আরো ১৫ হাজার টাকা।’

তিনি বলেন, ‘তারা শুধু নানান কৌশলে টাকায় হাতিয়ে নেয়, কিন্তু আর চাকরি দেয় না। দেই দিচ্ছি বলেই মাসের পর মাস পার করতে থাকে। আর টাকা আদায় করতে থাকে।’

এদিকে ভুক্তভোগীরা আরো জানান, ‘উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কেউ নাক, কান ও গলার চিকিৎসা করাতে আসলে ওই ডাক্তার নিয়ে আসতেন তার ব্যাক্তিগত চেম্বারে। আর সেখানেই তিনি অপারেশন থিয়েটার হলে অপারেশন করান।’

তারা বলেন, ‘আটক ডাক্তার আকেল মুহাম্মদ ও টাকা হাতিয়ে নেওয়া ওই চক্রের গভীর সম্পর্ক রয়েছেন। ডাক্তারকে দেখিয়ে তারা সেনাবাহিনীতে চাকরির প্রলোভন দেখাতেন। কারণ, তিনি একজন সাবেক মেজর। আর এতে ডাক্তার নিজেও ওদের সহযোগিতা করতো।’

ডাক্তার যদি প্রতারক চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত-ই না থাকতো, তাহলে দেশের এত জায়গা রেখে ওই এখানে নিয়ে আসতো কেন? প্রশ্ন ভুক্তভোগীদের।

আটক হওয়া উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক কান গলা বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ডা. মেজর (অব.) আকেল বলেন, ‘এখানে আমার ব্যক্তিগত রোগীদের অপারেশন করানো হয়। আর এতে সহযোগিতা করেন দুইজন নার্স। তারা হলেন, আজিজ ও সুলতান উভয়ে দক্ষ নার্স।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তারা দুজনই বিভিন্ন স্থানে নার্সিং প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। একাধিক হাসপাতালেও কাজ করেছেন তারা।’

নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমি শুধুমাত্র আমার ব্যক্তিগত রোগীদের এখানে অপারেশন করাই। সেনাবাহিনীতে চাকরি দেওয়া প্রতারকদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই।’

ওই চিকিৎসকের দাবি করা নার্স আজিজ সারাক্ষণকে বলেন, ‘আমি কোনো নার্স নই। আমি অপারেশনের পর শুধুমাত্র রোগীদের পাহারা দিই। আর চেম্বারটি পরিষ্কার করে রাখি।’

নার্স দাবি করা অপরজন সুলতান সারাক্ষণকে বলেন, ‘আমি এখানে ক্লিনারের কাজ করি। কোনো রোগীকে অপারেশনের সহযোগিতা করি না। ডাক্তার স্যার যা বলছেন তা সম্পূর্ণ ভুয়া।’

সেনাবাহিনীতে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা প্রতারক চক্রের আটকের বিষয়ে র‍্যাব-১ এর সহকারী এসপি মোর্শেদ সারাক্ষণকে বলেন, ‘আটক হওয়া ওই প্রতারক চক্রের সদস্যদের র‍্যাব-১ কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ। করা হবে।’

Print Friendly, PDF & Email

Please Share This Post in Your Social Media

কপিরাইটঃ ২০১৬ দৈনিক অন্যদিগন্ত এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Design & Developed BY It Host Seba  
Shares