শনিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২০, ১১:১০ অপরাহ্ন

গাইবান্ধায় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন ফ্রেন্ডশিপ

সঞ্জয় সাহা (গায়বান্ধা) প্রতিনিধি ।।

গাইবান্ধা শহর, সদর উপজেলা সহ জেলার সাতটি উপজেলার বিভিন্ন চড় অঞ্চলগুলিতে বাল্যবিয়ের প্রবণতা বেড়ে গেছে। অর্থনৈতিক অভাবই মূলত বাল্যবিবাহের প্রধান কারণ। তবে শহরের কিছু স্থানে বাল্যবিয়ের খবর পেলে প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিলেও সদর সহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার চড় অঞ্চলগুলিতে চিত্র ভিন্ন। চড় অঞ্চল গুলোতে পরিবারের মানুষের আর্থিক সংকট ও সচেতনতার অভাবে প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে বাল্যবিয়ে ঘটেই চলছে অভিভাবকরা। ১৮ বছর হওয়ার আগেই পরিবার থেকে বিয়ে দিচ্ছে তাদের কোমলমতি স্কুল পড়ুয়া কন্যা সন্তানকে। অনেক সময় সন্তানদের অমত থাকলেও তাদের অভিভাবকরা জোর করে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে তাদের। সে ক্ষেত্রে সন্তান ভূমিষ্ঠ কালে অকালে মৃত্যুবরণ করছে কোমলমতি সেসব মায়েরা। গত ৫ মাসে ১২টি বাল্য বিবাহ বন্ধ করেছে ফ্রেন্ডশিপ।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নের কড়াইবাড়ী গ্রাম ঘুরে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে ফ্রেন্ডশিপ এর উঠান বৈঠকের একটি চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন গাইবান্ধা ফ্রেন্ডশিপ এ,এস,ডি প্রজেক্ট ইনচার্জ দিবাকর বিশ্বাস, মাঠ কর্মী লতিফুল হক,কাজী নজরুল ইসলাম, সাংবাদিক সাদ্দাম হোসেন পবন, কায়ছার প্লাবন সহ অনেকে।

ফ্রেন্ডশিপ গাইবান্ধার বেসরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ট্রান্সিশন ফান্ড
এ,এস,ডি ( এ্যাসিসটেন্ট ফর সাসটেনেবল ডিভিলপমেন্ট) প্রজেক্ট এর আওতায় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি তারাও অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

গ্রামঅঞ্চল গুলোতে অসচেতন অভিভাবকদের নিয়ে উঠান বৈঠক করে বাল্যবিয়ের মত অপরাধজনক প্রবণতার অবসান ঘটাচ্ছে। ফলে আগের থেকে চড় অঞ্চল সহ বিভিন্ন গ্রাম গুলোতে বাল্যবিয়ের প্রবণতা অনেকটা কমে গেছে। সচেতন হচ্ছে সেসব পরিবারের অভিভাবকরা।

জানা গেছে, ফ্রেন্ডশিপ একটি বেসরকারি, অলাভজনক, অরাজনৈতিক, এবং সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। ফ্রেন্ডশিপ ২০০২ সাল হতে বাংলাদেশের দুর্যোগ প্রবণ অঞ্চলে বিশেষ করে চড় ও উপকলীয় এলাকায় দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষের জন্য কাজ করে আসছে। টেকসই উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগে সহায়ক হিসেবে মানুষের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন সংস্কৃতির রক্ষণ, সুশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম কার্যক্রম।

আয় বৃদ্ধিমূলক কাজের সুযোগ সৃষ্টি ও দুর্যোগ সহনশীল সক্রিয় সমাজব্যবস্থার মাধ্যমে দারিদ্রতা দূরিকরণ ও জীবন-জীবিকার মান উন্নয়নই ফ্রেন্ডশিপ প্রকল্পের লক্ষ্য।

অন্যদিকে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার ও সঞ্চয় তহবিল গঠনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আর্থিক সহযোগিতার মাধ্যমে চিহ্নিত হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করা। জীবিকায়নের মান উন্নয়নে সরকারি সেবা দানকারী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের হতদরিদ্রের প্রবেশাধিকারের সুযোগ সৃষ্টি/ বৃদ্ধি করা।

এ্যাডভোকেসি সহায়তায় স্থানীয় সম্পদ সন্নিবেশিত করার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভৌগলিক দুর্দশাগ্রস্থতা হ্রাস করণ এবং স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা প্রদানে ফ্রেন্ডশিপ (এ্যাসিসটেন্ট ফর সাসটেনেবল ডিভিলপমেন্ট) প্রজেক্ট প্রকল্পের উদ্দেশ্য।

শুধু তাই নয়- ফ্রেন্ডশিপ এ.এস.ডি প্রজেক্ট প্রকল্পের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ ও ফুলছড়ি উপজেলার অত্যন্ত ঝুকিপূর্ন, বন্যা প্রবন ও নদী ভাঙ্গন এলাকা। প্রতি বছর এ এলাকার মানুষ নদী ভাঙ্গন ও বন্যার ক্ষতিগ্রস্থের স্বীকার হচ্ছে। এই সুবিধা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুশাসন ও অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে আছে। এর ফলে, বাল্য বিবাহ, বহুবিবাহ, পারিবারিক সহিংসতা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বন্যার ক্ষতি দ্রুত কাটিয়ে ওঠার জন্য ফ্রেন্ডশিপ বিভিন্ন প্রকল্প হতে নিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রকল্প এ.এস.ডি।
ফ্রেন্ডশিপ এ.এস.ডি (এ্যাসিসটেন্ট ফর সাসটেনেবল ডিভিলপমেন্ট) প্রজেক্ট এই পিছিয়ে পরা জনগোষ্ঠী জীবনমান উন্নয়নের জন্য আধুনিক পদ্ধতি ও প্রযুক্তিতে কৃষি কাজ ও গবাদী প্রানী পালনের উপর প্রশিক্ষন দিচ্ছে। পুরুষের পাশা-পাশি নারীদেরও কাজে সম্পৃত করার জন্য বাড়ীর আঙ্গীনায় সবজী চাষ, হাঁস-মুরগি, ছাগল-ভেড়া পালন ইত্যাদি আয় বৃদ্ধি মুলক কাজের সাথে যুক্ত করছেন। এই ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠানটি উন্নত জাতের সবজি বীজ, ভেড়া ছাগল দেওয়ার পাশা-পাশি কৃষি সম্প্রসারণ ও প্রানি সম্পদ অধিদপ্তর দ্বারা প্রশিক্ষন দিচ্ছে।

তাছাড়া যুব উন্নয়ন, সমাজসেবা, বিআরডিবি, মহিলা অধিদপ্তর কর্তৃক প্রদত্ত সরকারী সুযোগ-সুবিধা চরের সুবিধা বঞ্চিতদের মাঝে বিতরণের জন্য সংস্থাটি অধিদপ্তর গুলোকে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। এলাকার রাস্তা-ঘাট মেরামত করার ক্ষেত্রেও ইউনিয়ন পরিষদকে সহযোগিতা করছে।

তাছাড়া উঠান বৈঠকের মাধ্যমে ঝুকিপূর্ন-সুবিধা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে সচেতনতা মুলক প্রশিক্ষন দিয়ে যাচ্ছে। যেমন-করোনা, আগাম বন্যা প্রস্তুতি, সম্মিলিত আপদ তহবিল গঠন, আইনি সেবা, গ্রাম আদালত, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন সহ সম-সাময়িক বিষয় ভিত্তিক আলোচনা হয়ে থাকে।

ফ্রেন্ডশিপ গাইবান্ধা জেলার কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে- গাইবান্ধা সদর উপজেলার সদর ইউনিয়নের আনালের ছড়া। কামারজানি ইউনিয়ন এর গোঘাট ও কড়াইবাড়ী গ্রাম। মোল্লারচর ইউনিয়নের সিধাই গ্রাম। ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া ইউনিয়নের কালাসোনা, কাবিলপুর ও রতনপুর। সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়ন এর পোড়ার চর, লাল চামার ইত্যাদি এলাকা।

বাল্যবিয়ে সম্পর্কে কামারজানির কড়াইবাড়ী গ্রামের “হাসনা বেগম” নামে এক অভিভাবক এর সাথে কথা হলে তিনি জানান- আর্থিক সংকটের কারণে আমার দশম শ্রেণীর স্কুল পড়ুয়া মেয়েকে বিয়ে দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমার বাড়ির পাশের উঠানে ফ্রেন্ডশিপের এ.এস,ডি প্রজেক্টে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে গ্রুপ মিটিংয়ের মাধ্যমে জানতে পারি যে অপ্রাপ্ত বয়সে বাল্যবিবাহ দিলে শারীরিক ক্ষতি হয়। বিয়ের পর সন্তান জন্মদান করলে জীবনের ঝুঁকি হয়। তখন বাল্যবিবাহ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসি। শুধু তাই নয় ফ্রেন্ডশিপ থেকে আর্থিক সহযোগিতা হিসেবে ভেড়ি ছাগল পেয়েছি। আমার মেয়ের সখ আছে নার্সিং পড়ার। আমার মেয়ে এস,এস,সি পাশ করার পর এসব ছাগল বিক্রি করে তাকে নার্সিং পড়ার জন্য ভালো কলেজে ভর্তি করে দেবো। আমার মেয়েকে আর বাল্যবিবাহ দিব না।

আবার দশম শ্রেণীর ছাত্রী ” জাকিয়া সুলতানা জুথির” সাথে কথা হলে সে জানায়- আমি বিয়ে করতে চাই নি। হঠাৎ করে আমার একটা বিয়ের ঘর আসে। তখন বাসার পাশে ফ্রেন্ডশিপের উঠান বৈঠকে বিষয়টি বললে তারা আমার অভিভাবক কে ডেকে বোঝালে আমার অভিভাবক বাল্যবিবাহের কুফল বুঝতে পেরে আমাকে আর বাল্যবিবাহ দেয়নি।

” মোছা: মমতা বেগম” নামে এক অভিভাবক এর সাথে কথা হলে সে জানায়- আমার পরিবারে অভাব-অনটন ছিল। আর এ কারণে আমার এক মেয়েকে ১১ বছর বয়সে বিয়ে দিছি। আমার আর এক মেয়ের অনিচ্ছা থাকার পরও আমার স্বামী আরেকটি বিয়ে ঠিক করতে ধরছিল। কিন্তু আমার বাসার পাশে ফ্রেন্ডশিপের এ,এস,ডি প্রকল্পের গ্রুপ মিটিংয়ে বাল্য বিয়ের কুফল সম্পর্কে জানতে পারি যে- বাল্য বিয়ে দিলে মৃত্যু ঝুঁকি থেকে যায়। মেজাজ খড় খড়া হয়। তখন আমি আমার স্বামীকে বাল্যবিয়ে দিতে নিষেধ করি। পরে আমাদের পরিবার চালানোর জন্য ফ্রেন্ডশিপ থেকে একটি ভেরি ছাগল ও শাক সবজির বিজ দিয়েছে। এখন সে ভেরি ছাগল থেকে চারটি ভেড়া ছাগল জন্ম হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে নদী ভাঙ্গনের কারণে যতটুকু জমি ছিল সেই জমিতে বীজ রোপন করে তিন ধরনের শাকসবজি চাষ করেছি। এখন সে সবজি আমরা নিজেরা খাই ও বাজারে বিক্রি করি। ফ্রেন্ডশিপ এর কারনে বর্তমানে আমাদের পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে।

অন্যদিকে- এবিষয়ে গাইবান্ধা “ফ্রেন্ডশিপ এ,এস,ডি প্রকল্পের প্রজেক্ট ইনচার্জ দিবাকর বিশ্বাস” জানান- গাইবান্ধা জেলার সীমান্তের একটি অংশ সুবিধাবঞ্চিত চর এলাকা। এরা বিভিন্ন রকম সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। গর্ভরমেন্ট এর সহযোগী হিসেবে আমরা কাজ করছি। এর মধ্যে অন্যতম বিষয় হচ্ছে বাল্যবিবাহ। আর এই বাল্যবিবাহ শহর থেকে চরাঞ্চলে অনেক বেশি। এখানখার মানুষজনের বিভিন্ন রকম সুযোগ সুবিধার পাশাপাশি রয়েছে সচেতনতার অভাব। তারা বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে জানেনা। অর্থনৈতিক অভাবই মূলত বাল্যবিবাহের প্রধান কারণ। আর এই দায়ভার কমাতে তারা তাদের মেয়েকে বাল্যবিবাহ দিচ্ছে। ফ্রেন্ডশিপ থেকে উঠান বৈঠকের মাধ্যমে আমরা তাদের বোঝাচ্ছি। গত ৫ মাসে আমরা অন্তত ১২ টি বাল্য বিয়ে বন্ধ করেছি। সুবিধা বঞ্চিত চড় এলাকার লোকদের উন্নয়নের জন্য আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছি। তাদের বিভিন্ন রকম প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। তাদের স্বাবলম্বী করার জন্য ফ্রেন্ডশিপ এর এ,এস,ডি প্রজেক্টের মাধ্যমে বীজ ভেড়া ছাগল বিতরণ করছি। বন্যা কবলিত এলাকায় প্রতিবছর বন্যা হওয়ায় ক্ষতির শিকার হচ্ছেন চরাঞ্চলের মানুষজন। আর এতে করে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে তারা। তাদের পরিবারকে সচ্ছলতা ফিরিয়ে দেয়ার জন্য ফ্রেন্ডশিপ এ,এস,ডি প্রজেক্টের এই আয়োজন।

**ফ্রেন্ডশিপ গাইবান্ধার আঞ্চলিক সমন্বয়কারী ” মোঃ আব্দুস সালাম” জানান- গাইবান্ধার দুর্গম চরাঞ্চলে সাধারণতঃ দারিদ্র্য ও সামাজিক পশ্চাৎপদতার কারণে মানুষ তাদের কন্যাশিশুদের বাল্যবিয়ে দিয়ে থাকেন। এসব ক্ষেত্রে ফ্রেন্ডশিপ তাদেরকে সংগঠিত করে আয় বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ, বাল্যবিয়ের ক্ষতিকর দিকগুলো আলোচনা করা, দলীয় এবং পারিবারিক সচেতনতা তৈরি করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বাল্যবিয়ে বন্ধে সহায়তা করা হয়। সেইসাথে তাদের জীবন-জীবিকার উন্নয়নের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করা হয়। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে সদস্যদের মাঝে কৃষি ও সবজি বীজ বিতরণ, ভেড়া বিতরণ ও পালনে সহযোগিতা করা হয়েছে। এছাড়াও তাদেরকে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর এবং ইউনিয়ন পরিষদের সাথে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

Print Friendly, PDF & Email

Please Share This Post in Your Social Media

কপিরাইটঃ ২০১৬ দৈনিক অন্যদিগন্ত এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Design & Developed BY It Host Seba Mobile: 01625324144
Shares