শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ১২:৫৩ অপরাহ্ন

সর্বশেষ সংবাদ

ফুটপাত ঘিরে কোটি টাকা চাঁদাবাজি

স্টাফ রিপোর্টার॥
রাজধানীর ফুটপাত ঘিরে সক্রিয় তিন শতাধিক চাঁদাবাজ। এরা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে লাইনম্যান হিসাবেই পরিচিত। এই লাইনম্যানরা লক্ষাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দিনে ৫০-৩০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে। এ হিসাবে দিনে কম করে হলেও এক কোটি টাকার চাঁদা আদায় হয়।
ভুক্তভোগীদের একটি সূত্র জানায়, কতিপয় রাজনৈতিক নেতা এবং কিছু সন্ত্রাসীসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি এসব লাইনম্যান নিয়ন্ত্রণ করছেন। এ ছাড়া প্রতিটি এলাকায়ই পুলিশের নামে চাঁদা তোলা হয়। ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাঁদা না দিলে ব্যবসা করা যায় না। মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে চাঁদাবাজরা ধরা পড়লেও আইনের ফাঁক গলে জামিনে বেরিয়ে আসে। আবার শুরু করে চাঁদাবাজি।

বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এমএ কাশেম বলেন, রাজধানীতে এক লাখের বেশি হকার রয়েছে। লাইনম্যান নামধারী চাঁদাবাজরা তাদের রক্ত চুষে খাচ্ছে। আমরা কিছুই করতে পারছি না। এসব চাঁদাবাজকে স্থানীয় কতিপয় রাজনৈতিক নেতা এবং পুলিশ শেল্টার দেয়। স্থানভেদে ৫০ থেকে শুরু করে ৮০, ১০০, ১৫০, ২০০ এবং ৩০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। তিনি বলেন, গড়ে ১০০ টাকা করে চাঁদা হিসাব করলেও দিনে এক কোটি টাকা চাঁদা ওঠে। আর মাসে এ অঙ্ক দাঁড়ায় ৩০ কোটিতে। তার মতে, মাসে এ হিসাবের দ্বিগুণ চাঁদা আদায় হয়। চাঁদাবাজ দমন করে সরকার যদি এ টাকা নিত, তবে বছরে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় হতো। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে পুলিশ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছিল। তারা জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও চাঁদাবাজিতে নামে। দুই সিটি করপোরেশন যদি প্রকৃত হকারদের কাছে ফুটপাত ইজারা দিত, তাহলে এমন অবস্থা হতো না।

জানা যায়, শুধু ফুটপাতের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে এমন গডফাদার গুলিস্তানে চার, সদরঘাটে তিন, নিউমার্কেটে তিন, মতিঝিলে তিন, ফার্মগেটে তিন, মিরপুর-১ নম্বরে দুই, ১০ নম্বরে দুই, উত্তরায় দুই, বাড্ডায় দুই, কুড়িলে দুজন রয়েছেন।

নিউমার্কেট এলাকার এক ব্যবসায়ী নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ এলাকায় একজন নিয়ন্ত্রক হকারদের রক্ত চুষতে চুষতে যাত্রাবাড়ীতে ১০ তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে বাড়ি তৈরি করছেন। এ ধরনের বেশ কয়েকজন রয়েছেন এ এলাকায়। এদের চাঁদা না দিলে ব্যবসা করা যায় না। তিনি বলেন, এরা ছাড়াও ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের কিছু ক্যাডার চাঁদা তোলে। এদের উৎপাত সারা বছরই সইতে হয়। এর বিরুদ্ধে কথা বললে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। গুলিস্তান খদ্দের মার্কেট এলাকার এক হকার বলেন, ‘এখানে চাঁদা দিয়েই ব্যবসা করি। ব্যবসা না করলে খাব কী? আমাগো নাম লিখবেন না, লিখলে কাল থেকে আর বসতে দেবে না।’ গুলিস্তান হকার্স, গাউছিয়া, নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, খিলগাঁও তালতলা, মিরপুর শাহ আলী, ১ নম্বর, গুলশান-১ ও ২, মিরপুরের মুক্তিযোদ্ধা সুপার, মুক্তবাংলা, উত্তরা ও পুরান ঢাকার ফুটপাতের ব্যবসায়ীরাও একই রকম তথ্য দেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বায়তুল মোকাররম জিপিও লিংক রোডে হলিডে মার্কেটে খোকন মজুমদার, আবুল হাসেম, মজিবর, পোটল, নসু, হারুন ও তার সহযোগীরা চাঁদা আদায় করে। উত্তরগেট এলাকায় দুম্বা রহিম, সাজু চাঁদা তোলে। শাপলা চত্বরে আরিফ; পল্টনে দুলাল ও তার সহযোগী; গুলিস্তানে আহাদ পুলিশ বক্স ও রাস্তায় আমিন, সাহিদ ও লম্বা হারুন; জুতাপট্টিতে সালেহ; গোলাপ শাহ মাজারের পূর্ব-দক্ষিণ অংশে ঘাউড়া বাবুল ও শাহীন টাকা তোলে। এ ছাড়া ওসমানী উদ্যানের পূর্ব ও উত্তর অংশে লম্বা শাজাহান; গুলিস্তান খদ্দর মার্কেটের পশ্চিমে কাদের ও উত্তরে হান্নান, পূর্বে সালাম, আক্তার ও জাহাঙ্গীর; গুলিস্তান হল মার্কেটের সামনের রাস্তায় লাইনম্যান সর্দার বাবুল; সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটের উত্তর পাশের রাস্তায় জজ মিয়া, পূর্ব পাশের রাস্তায় সেলিম মিয়া; মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামে মো. আলী, আবদুল গফুর ও বাবুল ভুঁইয়া; শাহবাগে ফজর আলী, আকাশ, কালাম ও নুর ইসলাম; যাত্রাবাড়ীতে সোনামিয়া, তোরাব আলী, মান্নান টাকা তোলায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। জুরাইন-পোস্তগোলায় খায়রুল, সিরাজ তালুকদার ও গরু হানিফ; লালবাগে আবদুস সামাদ, চানমিয়া ও ফিরোজ; মিরপুর-১-এ ছোট জুয়েল, আলী, বাদশা ও মিজান; মিরপুর-১১-এ আবদুল ওয়াদুদ, শফিক ও হানিফ; গুলশানে হাকিম আলী; কুড়িলে আবদুর রহীম ও নুরুল আমিন; এয়ারপোর্টে আকতার, মনির, ইব্রাহিম, জামাল ও বাবুল; উত্তরায় টিপু, নাসির ও হামিদ চাঁদা তোলে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাতে চাঁদাবাজির অভিযোগে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৭২ জনকে আসামি করে ৩ থানায় তিনটি মামলা করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সহকারী সম্পত্তি কর্মকর্তা মুহাম্মদ সামসুল আলম। মতিঝিল থানায় ১৬ জন, পল্টন থানায় ৪৯ জন এবং শাহবাগ থানায় সাতজনকে আসামি করে মামলা তিনটি হয়। শাহবাগ থানার মামলায় আসামি করা হয় লম্বু শাহজাহান, বাবুল, মানিক, ইমরান, দুলন, শাহীন ও আইয়ুবকে। পল্টন থানার মামলায় আসামি করা হয় লম্বা হারুন, দেলু, নাসির, মিন্টু, আলী, আবদুল গফুর, কাদের, খলিল, কোটন, জাহাঙ্গীর, নসু, সাজু, রহিম, নুরু, জাহাঙ্গীর, আবুল হাসেম কবির, আবদুল ওয়াদুদ, সরদার বাবুল, বুড়া সালাম, জুয়াড়ি সালাম, আক্তার, জাহাঙ্গীর, কালা নবি, আবদুর রব, কামাল, নজরুল, মনির, শফিক, হাসান, সোর্স শহীদ, বড় মিয়া, কালাম, বিমল বাবু, শওকত, হাবিব, ভোলা, কানা সিরাজ, আবদুল হান্নান, আলমগীর, সেকান্দার হায়াত, মুরসিকুল ইসলাম শিমুল, শফিকুর রহমান বাবুল, মঞ্জুর ময়িন, আবুল হোসাইন, আরিফ চৌধুরী, খোকন মজুমদার, খায়রুল বাশার, রফিকুল ইসলাম, সাত্তার মোল্লা ও আবুল হাসেমকে।

আর মতিঝিল থানায় করা মামলায় আসামিরা হলো : সাইফুল ইসলাম, শিবলু, শাহজাহান মৃধা, মকবুল, নূরুল ইসলাম, বাবলু, তাজুল ইসলাম, সাদেক, আবদুর রহিম, পবন, সাইজুদ্দিন, আবুল কালাম জুয়েল, আজাদ, কালা কাশেম, ফারুক ও সহিদ রেজা বাচ্চু।

এসব মামলার আসামিরা এখনো চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখেছে বলেও শুক্রবার কাছে জানিয়েছেন বাংলাদেশ হকার্স লীগের সভাপতি ও বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি এমএ কাশেম।

এ প্রসঙ্গে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় ফুটপাতের চাঁদাবাজরা অনেকটাই কোণঠাসা। পুলিশ অভিযোগ পেলে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। ডিএমপির জনসংযোগ বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার ইফতেখায়রুল ইসলামের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনিও মন্তব্য না করে বিষয়টি এড়িয়ে যান। জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা রাসেল সাবরিন বলেন, আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে, আমরা ফুটপাত হকার এবং চাঁদাবাজমুক্ত রাখতে অভিযান চালাচ্ছি।

 

Print Friendly, PDF & Email

Please Share This Post in Your Social Media

কপিরাইটঃ ২০১৬ দৈনিক অন্যদিগন্ত এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Design & Developed BY It Host Seba  
Shares