রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২০, ০৭:৪৬ পূর্বাহ্ন

সোনা চোরাকারবারেও শাহেদ

স্টাফ রিপোর্টার॥
আন্তর্জাতিক সোনা চোরাকারবারেও জড়িত ছিল প্রতারক মো. শাহেদ। তার ফোনের কললিস্টে চোরাকারবারিদের নাম পাওয়া গেছে। যেসব চোরাকারবারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছিল অথবা একাধিক জনের ওপর হুলিয়া আছে তাদের সঙ্গে সখ্য ছিল তার। এই চক্রটির সঙ্গে তার সখ্য গড়ে উঠে ভারতের জয়পুরে।

২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জয়পুরের একটি হোটেলে তাদের পরিচয় ঘটে। পরিচয় থেকে তাদের মধ্যে যাতায়াত সূত্রে মারিয়া তাকে সোনা চোরাকারবারে প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাব লুফে নেন প্রতারক জগতের জাদুকর শাহেদ। শাহেদের আমন্ত্রণে মারিয়া একাধিকবার বাংলাদেশে এসেছিল।
চক্রটি দুবাই থেকে পাশের দেশ হয়ে বাংলাদেশে সোনা নিয়ে আসতো। এরপর তারা সোনা সরবরাহ করতো দেশের কালো বাজারে। এছাড়াও শাহেদের সঙ্গে বাংলাদেশের ঢাকা বিমানবন্দরসহ নৌপথে যারা স্বর্ণ চোরাচালান করে থাকে তাদের সঙ্গে তার লিয়াজোঁর সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। র‌্যাবের রিমান্ডে শাহেদ তার দোষ স্বীকার করেছে। র‌্যাব জানিয়েছে, সাতক্ষীরার অস্ত্র মামলায় তাকে আলাদাভাবে রিমান্ড নেয়া হবে। এছাড়াও জানা গেছে, শাহেদের মাথায় মোট ২৯টি মামলার খড়গ ঝুলছে।

গত ৬ই জুলাই রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকার রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালায় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত ১৫ই জুলাই সাতক্ষীরার দেবহাটা এলাকায় অভিযান চালিয়ে রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক শাহেদকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। পরে পুলিশ তাকে আদালতে হাজির করলে আদালত ১০ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন। বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (উত্তর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আদেশে শাহেদকে র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করেন। গতকাল রোববার শাহেদের রিমান্ড শেষ হওয়ার পর আদালত চার মামলায় তার আরো ২৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জু করেন।

এ বিষয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ গতকাল জানান, র‌্যাবের রিমান্ডে শাহেদ তার প্রতারণার দোষ স্বীকার করেছে। তাকে আমরা আলাদাভাবে রিমান্ডে নিবো। তিনি আরো জানান, জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তা তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে আমরা তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিবো।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, শাহেদ বিভিন্ন কাজে বিদেশে যেতো। সে ৩টি দেশে বেশি যেতো। সেগুলো হচ্ছে- ভারত, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর। ২০১২ সালে শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে বিদেশ যাওয়ার সময় একটি উড়োজাহাজের মধ্যে এক ক্লিনারের সে নম্বর নিয়েছিল। ক্লিনার তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল যে, কেন তিনি তার নম্বর নিচ্ছেন? উত্তরে শাহেদ বলেছিলো, পরে তার সঙ্গে সে কথা বলবে। এরপর ওই ক্লিনারকে সে একদিন বিমানবন্দরের পাশের উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতালে তার চেম্বারে ডেকে নিয়েছিলো। আলাপচারিতায় তার কাছে জানতে চায় যে, একাধিক সোনা চোরাকারবারির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলে বা তাদের নম্বর দিলে তাকে মোটা অঙ্কের টাকা দেয়া হবে। এরপর একাধিকজনের নাম এবং নম্বর সংগ্রহ করে সে। পরে শাহেদ জানতে পেরেছে, ওই ক্লিনার নিজেও স্বর্ণ চোরাচালানকারী চক্রের সদস্য। তার নাম জানতে পেরেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
সূত্র জানায়, পাশের দেশের এক নারী চোরাকারবারির সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠে শাহেদের। তারা দুবাই থেকে স্বর্ণ চোরাই করে দেশে আনতো। স্বর্ণ চোরাকারবারিতে শাহেদের হয়ে দেখাশোনা করতো তার কর্মচারী মিজান। মূলত শাহেদের নির্দেশনায় সোনার চালান আনা-নেয়া করতো।

সূত্র জানায়, শাহেদকে জিজ্ঞাসাবাদে জানতে চাওয়া হয়, কোন সূত্র ও সাহসের ওপর ভর করে সরকারি প্রটোকল নিতো সে। উত্তরে জানান, ঢাকার বাইরে তিনি গেলে তার সঙ্গে একাধিক গাড়ি এবং গ্যানমান দেখে সরকারের অনেক লোক ভড়কে যেতো। সবাই মনে করতো, সে অনেক বড়সড় লোক। এ সময় সে কাউকে পাত্তা দিতো না। তখন সে পুলিশকে নানা কাজে ব্যবহার করেছে। এছাড়াও একাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে তার নামে হওয়া মামলাগুলো থেকে গ্রেপ্তারি পরোওয়ানা ঠেকিয়েছে।

সূত্র জানায়, শাহেদ গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তার মাথায় ১৬টি মামলা ঝুঁলছিল। গ্রেপ্তার হওয়ার পর আরো তার বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা হয়। ২০০৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত মামলাগুলো বিভিন্নজন দায়ের করেছেন। অধিকাংশ প্রতারণার। পুরনো মামলাগুলোর মধ্যে শাহেদ ৪টিতে খালাস পেয়েছে। ৫টি মামলার বিচার স্থগিত হয়ে গেছে। ২টির অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় তাকে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে ২টিতে। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু জানান, শাহেদ যে মামলাগুলোতে খালাস পেয়েছে তার রেকর্ড বের করে দেখতে হবে। খালাসের পর রাষ্ট্র কোনো আপিল করেছে কিনা- তাও দেখতে হবে। তিনি আরো জানান, প্রয়োজনে আমরা খালাসের বিরুদ্ধে আপিল করবো। আর যেসব মামলা স্থগিত রয়েছে তা চালু করার বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে।

Print Friendly, PDF & Email

Please Share This Post in Your Social Media

কপিরাইটঃ ২০১৬ দৈনিক অন্যদিগন্ত এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Design & Developed BY It Host Seba Mobile: 01625324144
Shares