রমজানে অন্য দেশে দ্রব্য মূল্য কমে, আর আমাদের দেশে কেন বাড়ে? | অন্যদিগন্ত

শুক্রবার, ২৩ অগাস্ট ২০১৯, ১২:৩৪ অপরাহ্ন

রমজানে অন্য দেশে দ্রব্য মূল্য কমে, আর আমাদের দেশে কেন বাড়ে?

এম. এ. আলিম খান ॥

রমজান মাস এলেই নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য মূল্য লাগামহীন হয়ে পড়ে, যা নিন্ম ও মধ্যবিত্ত মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশে মূল্য ছাড়ের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। রমজানে কেন বাড়ে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য তা অনুসন্ধান করে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন: ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফা প্রবণতা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি, ক্রেতাদের অধিক ক্রয় প্রবণতা ও অপর্যাপ্ত বাজার পর্যবেক্ষণ।

মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রমজান মাসে পণ্য দ্রব্যে ছাড় দেয়া হয়। বাজার দর যাতে স্বাভাবিক থাকে এজন্য সরকারিভাবে নজরদারি করা হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থ ও শিল্প মন্ত্রণালয় ৫০০ ভোগ্য পণ্যে মূল্যহ্রাসের নির্দেশনা জারি করেছে। শারজায় রমজানে পণ্যমূল্য ছাড় এসেছে। ১০ হাজার ভোগ্য পণ্যে সীমিত মূল্য বিক্রি করা হচ্ছে। এসব পণ্যে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় দেয়া হয়েছে। শুধু মূল্যছাড়ই নয় শারজা কর্তৃপক্ষ ২৫ হাজার পণ্যের মূল্য সংযোজন কর না নেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছে। সৌদি আরবের বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ কোম্পানি রমজানে ১২ হাজার পণ্যে মূল্যছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে। খাদ্য পণ্যে সর্বোচ্চ ৭৭ শতাংশ এবং খাদ্যপণ্য ছাড়া অন্য পণ্যে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ মূল্য ছাড় দিবে। কাতারে ৫০০ ভোগ্য পণ্যে রমজানে মূল্যছাড় দিয়েছে। মালয়েশিয়া সরকার ১০টি ভোগ্য পণ্য নির্ধারিত দামে বিক্রির বিক্রির নির্দেশনা জারি করেছে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর রমজানে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য মূল্যবৃদ্ধি পায়। এজন্য দ্রব্য মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মাথাব্যাথার অন্ত নেই। সারা বছর যাই হোক রোজার সময় সবাই নড়েচড়ে বসেন দ্রব্য মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে। জনসচেতনতা সৃষ্টি করে, আইন প্রয়োগ করে এবং নিদিষ্ট পণ্যে ভর্তূকি দিয়ে লক্ষ্য একটাই দ্রব্য মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে রমজান মাসে ভোক্তা অধিকার রক্ষায় ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা জোরদার করা হয়। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামও রমজানে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিও বিষয়টি স্বীকার করে বলেছেন, ‘পৃথিবীর দেশে দেশে উৎসব আনন্দে পণ্যের দাম কমে বাংলাদেশে বাড়ে।’ প্রতি বছর রমজানে মাসে বাংলাদেশে ১০ থেকে ২০ পণ্যের দাম বাড়ে। সরকার যদি আগে থেকেই ব্যবস্থা নেন তাহলে রমজানে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব।

সম্প্রতি বিবিসি বাংলার এক সাক্ষাৎকারে মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম বলেছেন, ‘গত তিন বছরে বাংলাদেশে মাংসের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। চাঁদাবাজরা যদি পশুর ওপর চাঁদাবাজি বন্ধ করে তাহলে প্রতি কেজি ৩০০টাকায় মাংস বিক্রি সম্ভব।’ কি করলে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে এ প্রসঙ্গে রবিউল আলম বলেন, ‘মূলত সিটি কর্পোরেশনের আন্তরিকতার অভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না চাঁদাবাজি। সিটি কর্পোরেশন চাইলে এই চাঁদাবাজি এক মিনিটে বন্ধ করতে পারে।

বাংলাদেশে ক্রেতা ও ভোক্তাদের জাতীয় প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর জীবনযাত্রার ব্যয় সম্পর্কিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, বেড়েই চলেছে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়। ২০১৬ সালে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৬.৪৭ শতাংশ এবং ২০১৭ সালে বেড়েছে ৮.৪৪ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৬ সালে পণ্য দ্রব্য ও সার্ভিসের মূল্য বেড়েছে ৫.৮১ শতাংশ এবং ২০১৭ সালে বেড়েছে ৭.১৭শতাংশ। ২০১৮ সালে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৬ শতাংশ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রমজান মাস এলেই কেন নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য মূল্য লাগামহীন হয়ে পড়ে? যা নিন্ম ও মধ্যবিত্ত মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। বাজার বিশ্লেষকরা অনুসন্ধান করে দেখেছেন, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ার কারণ হচ্ছে ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফা প্রবণতা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি, ক্রেতাদের অধিক ক্রয় প্রবণতা, অপর্যাপ্ত বাজার পর্যবেক্ষণ, ডলারের দাম বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রব্য মূল্যের প্রভাব।

দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে এখন অতি মুনাফা লোভী ব্যবসায়ীরা নিত্য নতুন কৌশলের আশ্রয় নেয়। সমালোচনা এড়াতে বিভিন্ন অজুহাতে রোজার আগেই বাড়িয়ে দেন কতিপয় নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম। ঢাকা দক্ষিণের নগর পিতা সাঈদ খোকন রমজান মাসে দ্রব্যমূল্যে স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ী নেতাদের প্রতি আহবান করেছেন। তিনি রমজান মাসে রাজধানীতে মাংসের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছেন। দাম বেশি নিলে কঠোর হুশিয়ারি দিয়েছেন।

বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য ও পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী রাষ্ট্রীয় সংস্থা হল বাংলাদেশ স্ট্যার্ন্ডাডস এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। আর ভোক্তাদের অধিকার দেখার জন্য রয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। বিগত ৬ এপ্রিল ২০০৯ তারিখে ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯’ প্রণিত হয়েছে। ভোক্তার নিরাপদ খাদ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার ‘নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩’ নামে আরও একটি আইন করেছে। এই আইন সরকার ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ থেকে কার্যকর করেছে। যেখানে ভেজাল, দূষিত বা অনিরাপদ খাদ্য বিক্রয় করা হলে ক্রেতা যদি অভিযোগ করে আর এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিক্রেতার সর্বোচ্চ ৫বছর কারাদন্ড এবং ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

এই দুইটি আইনের মাধ্যমে দেশে বাজার তদারকি করা হয়। ভোক্তার অধিকার লংঘিত হলে এই আইন অনুযায়ী অভিযোগ দায়েরের সুযোগ রয়েছে। দায়েরকৃত আমলযোগ্য অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত ও জরিমানা আরোপ করা হলে ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯’ এর ধারা ৭৬ (৪) অনুযায়ী আদায়কৃত জরিমানার ২৫% তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগকারীকে প্রদানের বিধান রয়েছে।

জনসচেনতার জন্য সবাইকে জানা প্রয়োজন ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯’ কি এবং এই আইন অনুযায়ী ভোক্তা অধিকার বিরোধী কাজই কি?
অর্থনীতির ভাষায়, রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকই ভোক্তা। প্রত্যেক ভোক্তার রয়েছে অধিকার। কিন্তু ভোক্তার অধিকার কি, তা জানেই না অধিকাংশ ভোক্তাই। ভোক্তা অধিকার বিরোধী কাজসমূহ হল: ১. কোন আইন বা বিধির অধীন নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্যে কেনা পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রি করা বা করার প্রস্তাব দেয়া, ২. জ্ঞাতসারে ভেজালমিশ্রিত পণ্য বা ওষধ বিক্রি করা বা করার প্রস্তাব করা, ৩. জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্বকভাবে   ক্ষতিকারক কোন দ্রব্য, কোন খাদ্য পণ্যের সাথে মেশানো, যার মিশ্রণ কোন আইন বা বিধির অধীনে নিষদ্ধি করা হয়েছে। এভাবে নিষিদ্ধি দ্রব্য মেশানো কোন পণ্য বিক্রি করা বা বিক্রির প্রস্তাব করা, ৪. কোন পণ্য বা সেবা বিক্রির উদ্দেশ্যে অসত্য বা মিথ্যা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রেতা সাধারণকে প্রতারিত করা, ৫. প্রদত্ত মূল্যেও বিনিময়ে প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রি বা সরবরাহ না করা, ৬. কোন পণ্য বিক্রি বা সরবরাহের সময় ভোক্তাকে প্রতিশ্রুত ওজনের চেয়ে কম ওজনের পণ্য বিক্রি বা সরবরাহ করা

৭. কোন পণ্য বিক্রি বা সরবরাহের উদ্দেশ্যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ওজন পরিমাপের কাজে ব্যবহৃত বাটখারা বা ওজনপরিমাপক যন্ত্র প্রকৃত ওজনের চেয়ে অতিরিক্ত ওজন প্রদর্শনকারী হওয়া, ৮. কোন পণ্য বিক্রি বা সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত ওজনের চেয়ে কম পরিমাপের পণ্য বিক্রি বা সরবরাহ করা, ৯. কোন পণ্য বিক্রি বা সরবরাহের উদ্দেশ্যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দৈঘ্য পরিমাপের কাজে ব্যবহৃত পরিমাপক ফিতা বা অন্য কোন কিছু প্রকৃত দৈঘ্যের চেয়ে বেশি দৈর্ঘ্য প্রদর্শনকারী হওয়া, ১০. কোন নকল পণ্য বা ওষধ প্রস্তুত বা উৎপাদন করা, ১১. মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বা ওষধ বিক্রয় করা বা করতে প্রস্তাব করা এবং ১২. সেবা গ্রহীতার জীবন বা নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে এমন কোন কাজ করা, যা কোন আইন বা বিধির অধীনে নিষদ্ধি করা হয়েছে। এসব পরিস্থিতির উদ্ভব হলে প্রতিকার চেয়ে অভিযোগ দাখিল করলে, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ভোক্তা অধিকার রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা রাখবে।

অধিকাংশ ব্যবসায়ী জানেই না আসলে ভোক্তা অধিকার আইনে কি বলা হয়েছে। ভোক্তা অধিকার বিরোধী কাজই কি কি? কোন ভোক্তার অধিকার লংঘন হলে তিনি বিক্রেতার বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নিতে পারেন? ইসলামসহ অধিকাংশ ধর্মগ্রস্থে ব্যবসা ও ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে কি বলা হয়েছে।
ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্যকে ইবাদত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেও একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। কুরআন ও হাদিসে ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে বর্ননা করা হয়েছে। রসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, যে ব্যবসায়ী তার ব্যবসায় সততা ও আমানতদারী রক্ষা করবে, কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদগণের সঙ্গে তার হাশর হবে।’ (সুনানে তিরমিযী: হাদিস নং ১১৩০; সুনানে দামেরী হাদিস নং ২৪২৭)।

ওজনে বা মাপে কম দেয়া প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তাআলা কুরআনে এরশাদ করেছেন, ‘বহু দুঃখ আছে তাদের যারা মাপে কম দেয়, যারা মানুষের কাছ থেকে যখন মেপে নেয়, পূর্ণমাত্রায় নেয়। আর যখন অন্যকে মেপে ও ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়। তারা কি চিন্তা করে না, তাদের এক মহা দিবসে জীবিত করে ওঠানো হবে? যে সব মানুষ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সামনে দাঁড়াবে।’ (সূরা মুতাফফিফীন: আয়াত ১-৬)
শুধু আইন দিয়েই রমজানে বাজারের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন জনসচেনতা সৃষ্টি এবং ব্যবসায়ীদের ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ। পাশাপাশি মাঠ (ফসল ক্ষেত) থেকে বাজার পর্যন্ত যাতে কোন রকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই পণ্যসামগ্রী পৌছাতে পারে সেদিকে নজর দিতে হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

কপিরাইটঃ ২০১৬ দৈনিক অন্যদিগন্ত এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Design & Developed BY Seskhobor.Com
Shares
CrestaProject