'রামের সুমতি' পড়েছি, 'রাজনীতিকদের সুমতি' পড়তে চাই | অন্যদিগন্ত

শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৫:০৯ পূর্বাহ্ন

‘রামের সুমতি’ পড়েছি, ‘রাজনীতিকদের সুমতি’ পড়তে চাই

সুজন বা সুশাসনের জন্য নাগরিক সংগঠনটি বেশ ক’বছর ধরে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের হালচাল নিয়ে গবেষণা করে চলেছে।

সুশাসনের অনুশীলন একটি বিশাল ব্যাপার। খুব দ্রুত একটি দেশে সর্বাঙ্গীণভাবে সুশাসন কায়েম হবে এমনটি কেউ আশা করে না। তবে এটুকু আশা করে যে, যতই দিন যাবে দেশের নাগরিকরা সুশাসনের সুফল উত্তরোত্তর বেশি করে পেতে থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এর সম্পূর্ণ বিপরীত।

যতই দিন যাচ্ছে ততোই মনে হচ্ছে এদেশে সুশাসন সুদূরপরাহত হয়ে উঠছে। সুশাসনের অভাব যে কত বিভীষিকাময় হয়ে উঠতে পারে তার নজির আমরা দেখতে পাচ্ছি অতি নিষ্ঠুর ধরনের সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে। দেশে সুশাসন না থাকলে মানুষের মনজগতেও যে নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটে, সাম্প্রতিককালের খুন-ধর্ষণের মতো ভয়ংকর ঘটনাগুলো তারই ইঙ্গিত দেয়।

অপরাধপ্রবণতা সব কালে সব যুগে কিছু না কিছু ছিল। কিন্তু এই প্রবণতা মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে যাওয়ার জন্য কী ব্যাখ্যা হাজির করা সম্ভব। সুশাসনের মূল কথা হল দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন। সমাজ যখন দুর্বৃত্তায়িত হয়ে ওঠে তখন শিষ্টরা হয়ে পড়ে কোণঠাসা এবং দুষ্টরা হয়ে ওঠে দুর্বিনীত। এরকম অবস্থায় সামাজিক অপরাধসহ সব ধরনের অপরাধ বৃদ্ধি পেতে থাকে।

মানুষের মধ্যে ‘সু’ ও ‘কু’ প্রবৃত্তি পাশাপাশি অবস্থান করে। মানুষ আত্মসংযম ও আত্মশাসনের শক্তিকে ব্যবহার করে কুপ্রবৃত্তি থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু যখন রাষ্ট্রের শাসকবর্গের মধ্যে সুবিবেচনার চেয়ে কুবিবেচনা দেখা দেয়, তখন শাসিতরাও ভাবতে থাকে ওরা যদি এসব করে পার পেয়ে যায়, তাহলে আমাদের পক্ষে বিচ্যুত হওয়া কি অস্বাভাবিক?

গত ৯ জুলাই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে নানা অসঙ্গতি তুলে ধরে ‘সুজন’ বলেছে, এ নির্বাচন অনিয়মের খনি, একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। এ নির্বাচনে ১০৩টি আসনের ২১৩টি ভোট কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। এটা কোনক্রমেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।

ভোটারদের মধ্যে কেউ কি মৃত্যুবরণ করেনি? কেউ কি অসুস্থ থাকার ফলে ভোট কেন্দ্রে আসতে পারেনি? অথবা কেউ কি বিদেশে বা অন্যত্র কোথায় অবস্থান করছিল না? এসব প্রশ্নের আলোকে অবশ্যই বলা যায়, শতভাগ ভোট পড়া প্রায় অসম্ভব! ৭৫টি আসনের ৫৮৬ কেন্দ্রে সব ভোট নৌকায় এবং একটি কেন্দ্রে পড়েছে ধানের শীষে। এটাইবা কী করে সম্ভব? বাংলাদেশে এমন কোনো গ্রাম বা মহল্লা পাওয়া যাবে না যেখানে বড় দুটি দলের সমর্থক ও ভোটার কম-বেশি নেই। ১২৮৫ কেন্দ্রে ধানের শীষে এবং ২টি কেন্দ্রে নৌকা প্রতীকে একটিও ভোট পড়েনি।

গত ৯ জুলাই ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য উপস্থাপন করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের সমন্বয়ক দিলীপ কুমার সরকার। তিনি আরও জানান, ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪টি আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তার ঘোষিত তাৎক্ষণিক ফলাফলের সঙ্গে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলে অমিল রয়েছে। এসব কেন্দ্রে ১.০৯ শতাংশ থেকে ৩.১৭ শতাংশ পর্যন্ত ভোটের ব্যবধান পাওয়া গেছে। নির্বাচনে মহাজোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ভোটের ব্যবধানও অস্বাভাবিক।

অনেক কেন্দ্রে অস্বাভাবিকহারে বাতিল ভোট পড়েছে। সাধারণত নির্বাচনে বাতিল ভোট পড়ে খুবই নগণ্য পরিমাণে। কিন্তু যখন দেখা যায় ধারাবাহিকভাবে ব্যালট পেপারগুলোতে ভোটের সিল এমনভাবে দেয়া হয়েছে যে সেগুলো বাতিল না করার কোনো উপায় থাকে না, যখন বাতিল ভোটের হার অস্বাভাবিক মাত্রায় দেখা যায় তখন বুঝতে হবে হয় সংশ্লিষ্ট ভোটাররা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন, যা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। অথবা দুষ্কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি ব্যালট পেপার দখল করে ইচ্ছাকৃতভাবে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে যা দায়িত্বশীলদের কেউ প্রতিহত করেনি। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল ব্যালট পেপারের তুলনায় ইভিএম কেন্দ্রগুলোতে ভোটের হার কম। একই যাত্রায় এরকম বিপরীতমুখী ফলাফল কী করে হতে পারে তা আমাদের কল্পনা ও চিন্তার অগোচরে রয়ে গেছে।

সুজনের পক্ষ থেকে যারা সাংবাদিক সম্মেলনে কথা বলেছেন তাদের প্রায় সবাই নির্বাচনে অনিয়মের ঘটনা তদন্ত করতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করার দাবি জানান। পাশাপাশি এই ইসির অধীনে আর কোনো নির্বাচন আয়োজন না করারও সুপারিশ করেছেন তারা। সুজনের পক্ষ থেকে যারা কথা বলেছেন তাদের কোনো দলের সঙ্গে ব্রাকেটবন্দি করা যাবে না। তারা যা বলেছেন তা তাদের বিবেকের তাড়নায় এবং তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেই বলেছেন। তাদের একটি বড় অভিযোগ হল, ফলাফল প্রকাশে নির্বাচন কমিশন জালিয়াতি করেছে।

নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। মানুষের মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা যদি সম্পূর্ণটাই ভেঙে পড়ে তাহলে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। অভিজ্ঞতা বলে বাংলাদেশের কোনো নির্বাচনই প্রশ্নবিদ্ধতা থেকে মুক্ত ছিল না। তবে তুলনামূলকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো বড় বড় রাজনৈতিক দল দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ হলেও জনগণের কাছে সেভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি।

আদালতের রায়ের অজুহাত টেনে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বিলোপ করা হয়েছে। এই অবস্থায় ক্ষমতাসীন দল যেনতেন প্রকারে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করার আত্মঘাতী তৎপরতায় মেতে উঠেছে। এতে সাময়িক সুবিধা পাওয়া গেলেও দেশ, জাতি ও সমাজ বিপদমুক্ত থাকতে পারছে না।

কারণ নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু রাজনৈতিক ট্রানজিশনের সম্ভাবনা তিরোহিত হয়েছে। যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য নির্বাচন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্বাচন ব্যবস্থা যদি ভেঙে পড়ে এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে যদি পক্ষপাতিত্ব বা অনিয়ম দেখেও না দেখার ভান করার অভিযোগ ওঠে, তাহলে দেশ নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে পতিত হতে পারে যা কোনো দেশপ্রেমিকের কাম্য নয়।

বিরোধী দলগুলো নতুন একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি তুলেছে, যা হতে হবে একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। তারা কতটুকু জনমতকে তাদের প্রতি সক্রিয়ভাবে আদায় করতে পারবে সেটা ভবিষ্যৎই বলে দেবে। একথা অনস্বীকার্য যে, সরকারের নানা রকম দমন-পীড়ন এবং বাধাবিপত্তির ফলে বিরোধী দল বা জোটগুলো মানুষের সমাবেশ ঘটাতে পারছে না।

রাজনৈতিক দলগুলোর যে কোনো আন্দোলনের প্রয়াসকে শক্তভাবে দমন করা হয়। এর বিপরীত চিত্র আমরা দেখতে পাই ছাত্রদের ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন। কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং সবশেষে নিরাপদ সড়কের আন্দোলন ব্যাপক সমর্থন লাভ করেছে। কিছু অঘটন ঘটাতে প্রয়াসী হয়েও সরকারপক্ষ শেষ পর্যন্ত সমঝোতার পথই বেছে নিয়েছে। তাহলে কি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আন্দোলনের নেতৃত্বকেও হতে হবে নির্দলীয় প্রকৃতির?

গত কয়েক মাসে সুদানে ওমর আল বসিরের সরকার ও পরবর্তী সময়ে সামরিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে যে ব্যাপক গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি হয়েছে তার নেতৃত্ব দিয়েছে সুদানের প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েশন। গত ২০-৩০ বছরের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এরকম একটি প্রবণতা বিভিন্ন দেশে লক্ষ করা গেছে। বাংলাদেশেও কি সুদানের অনুরূপ প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েশন বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্য আন্দোলন গড়ে তুলবে? বাংলাদেশের বাস্তবতায় এমন কিছু ঘটবে বলে মনে হয় না।

কারণ এখানে প্রফেশনাল বা পেশাজীবীরাও দলীয় ব্রাকেটে বন্দি হয়ে আছেন। দলীয় ব্রাকেটবন্দি করার তৎপরতায় যেসব রাজনৈতিক দল আদাজল খেয়ে নেমেছিল, তারা আর যাই করুক নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য কোনো মঙ্গল সাধন করেনি। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের জন্য নিষ্ঠাবান সিভিল সোসাইটির প্রয়োজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ভাগ্যের বিষয়, বাংলাদেশে এখন আর সিভিল সোসাইটির দেখা পাওয়া যায় না।

এন্টোনিও গ্রামসি যে ধরনের সিভিল সোসাইটির কথা বলেছেন, যারা প্রয়োজনে জনগণের স্বার্থে টানেল ওয়ারফেয়ার ধরনের প্রতিরোধ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়বে তেমন সিভিল সোসাইটি এদেশে অদূর ভবিষ্যতে দাঁড়াতে পারবে কিনা সন্দেহ। সন্দেহ, অবিশ্বাস, অনাস্থা ও চানক্য রাজনীতি দেশের জন্য খুবই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এখনও সময় আছে, সবার যেন সুমতি হয়। দেশের রাজনীতিক সম্প্রদায়কে শরৎচন্দ্রের ‘রামের সুমতি’ উপন্যাসটি পড়তে বলি।

ড. মাহবুব উল্লাহ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

Print Friendly, PDF & Email

Please Share This Post in Your Social Media


কপিরাইটঃ ২০১৬ দৈনিক অন্যদিগন্ত এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Design & Developed BY Seskhobor.Com
Shares
CrestaProject