আজও পায়নি দুর্গাপূজার উৎপত্তিস্থল তাহেরপুরে পুণ্যভূমির স্বীকৃতি | অন্যদিগন্ত

শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ০৬:০৩ পূর্বাহ্ন

আজও পায়নি দুর্গাপূজার উৎপত্তিস্থল তাহেরপুরে পুণ্যভূমির স্বীকৃতি

নিজস্ব সংবাদদাতা ॥

আগামী ৪ঠা অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্যদিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে সনাতন ধর্মালম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দূর্গা পূজা। বারো মাসে তের পর্বণ কথাটি হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য প্রচলিত থাকলেও শারদীয়া বা দূর্গা পূজাই বেশি আনন্দ উৎসবের মাধ্যমে পালন করা হয়।

হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা প্রথম শুরু হয় বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার তাহেরপুর পৌরসভার রাজবাড়ির দূর্গা মন্দিরে। ৫৩৮ বছর আগে সম্রাট আকবরের শাসনামলে রাজা কংস নারায়ণ সে সময় ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে শুরু করেন এ দুর্গাপূজা। তাই দুর্গাপূজার উৎপত্তিস্থল হিসেবে গর্ববোধ করেন তাহেরপুরের অধিবাসীরা।

দুর্গাপূজার উৎপত্তিস্থল হিসেবে ইতিহাস খ্যাত তাহেরপুর হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পুণ্যভূমির স্বীকৃতি আজও পায়নি। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায়ের জন্য হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক নেতারা অনেক সময় চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে তাহেরপুরে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হলে প্রতি বছর শারদীয় দুর্গাপূজার সময় বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীদের মিলন মেলায় পরিণত হতো স্থানটিতে।

এদিকে ১৪৮০ সালে সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে বাংলার বারো ভূঁইয়ার অন্যতম রাজা কংস নারায়ণ রাজশাহীর তাহেরপুরের তাহের খানকে যুদ্ধে পরাজিত করেন। সেই সময় যুদ্ধজয়ের স্মৃতি ধরে রাখতে রাজ পুরোহিত রমেশ শাস্ত্রীর পরামর্শে রাজা কংস নারায়ণ দুর্গাপূজার আয়োজন করেন রাজবাড়ির গোবিন্দ মন্দিরে। তার আহ্বানে মা দুর্গা স্বর্গ থেকে সাধারণ্যে আবির্ভূত হন। সেই সময় ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে কংস নারায়ণ প্রথম যে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন সেই প্রতিমা ছিল সোনার তৈরি। এরই ধারাবাহিকতায় আজ পর্যন্ত সারা বিশ্বের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব হিসেবে দুর্গাপূজা স্বীকৃত পায়।

দুর্গাপূজার গোড়ার কথা কালক্রমে যাতে হারিয়ে না যায় সে জন্য তাহেরপুরে রাজা কংস নারায়ণ প্রথম দুর্গাপূজা সৃষ্টি, মন্দির ও জায়গা রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কমিটি গঠিত করেছিল। এ কমিটি লোকজন দুর্গাপূজার উৎপত্তিস্থল তাহেরপুরকে বাঙালী হিন্দুদের শারদীয় উৎসবের পুণ্যস্থান হিসেবে স্বীকৃতি পেতে বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে সরকারের কাছে আবেদন করেও স্বীকৃতি আদায়ে ব্যর্থ হয়েছে। সে সময় আধুনিক দুর্গোৎসব পদ্ধতি পতি রমেশ শাস্ত্রী প্রণীত। এ মহাযজ্ঞের প্রথম অনুষ্ঠান হয়েছিল রাজা কংস নারায়ণ রায়ের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ষোড়শ শতাব্দির শেষ ভাগে। অনুষ্ঠানের স্থানটি ছিল বারনই নদীর পূর্ব তীরে রামরামার অর গ্রামের দুর্গামন্দিরে। প্রথম দুর্গাপূজার সেই স্থানটি এখন ধ্বংসস্তুপ। এলাকাবাসী স্থানটি সংরক্ষণ করে ধর্মীয় তীর্থস্থান ও পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছে দীর্ঘদিন থেকে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এক অধ্যাপক জানান, তাহেরপুর ছিল রাজা কংস নারায়ণের সাংস্কৃতিক রাজধানী। এখানে বসে কৃক্তিবাস রামায়ণের বঙ্গানুবাদ করেছিলেন। ঐতিহাসিক এ স্থানে প্রতি বছর দুর্গাপূজার সময় জাতীয় উৎসব পালনের দাবি করেছেন তিনি। তাহেরপুরে পর্যটকদের তীর্থস্থান করার দাবিতে ২০০২ সালে কমিটির সম্পাদক সঞ্জীব রায় মিন্টু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর দফতরসহ বিভিন্ন জায়গায় আবেদন করেন। কিন্তু পুণ্যভূমি হিসেবে স্বীকৃতি তো দূরের কথা, এখানে উন্নতমানের একটি মন্দিরও সরকারের পক্ষ থেকে নির্মিত হয়নি আজও।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আক্ষেপ করে বলেন, জনপ্রতিনিধিরা ভোটের আগে হিন্দুদের অনেক মিথ্যা আশ্বাস দেন। কিন্তু ধর্মীয় ব্যাপারে তেমন কোনো কাজ করেন না। এখানকার রাজবাড়ীর গোবিন্দ মন্দিরে একটি বৃহৎ শিলালিপি রয়েছে। এতে দুর্গাপূজার প্রতিষ্ঠা, স্থান,সন, তারিখ ও অতীত কিছু ইতিহাস লিপিবদ্ধ রয়েছে। এ শিলালিপি ছাড়া এখানে আর তেমন কিছু নিদর্শন নেই। তাহেরপুরের দুর্গাপূরীতে দেবী দুর্গার মূলবেদী পর্যন্ত এখন নেই। বর্তমানে দুর্গাপূরীর বেদীমূলে স্থাপিত হয়েছে তাহেরপুর কলেজ। তার পাশে তিনশ’ বছরের প্রাচীন গাছটির নাম না জানার কারণে অচিন বৃক্ষ হয়ে কালের স্মৃতি বহন করছে। তবে হিন্দু শাস্ত্রীয় মতে, মা দুর্গার জন্ম স্বর্গে। সব দেবতার মহাতেজশক্তি নিয়ে মহাপরাক্রমশালী মহিষাসুরকে বধ করার মানসে ক্রেতাযুগে রাবনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দশরথ পুত্র মহামতি রাম মা দুর্গার অকালবোধন পূজা করেন। মা দুর্গা তার পূজায় সন্তুষ্ঠ হয়ে রাবন বধের বর প্রদান করেন। বর পেয়ে রাম লংকারাজ রাবনকে বধ করতে সক্ষম হন।

এদিকে এলাকার সনাতন ধর্মালম্বিদের নেতৃবৃন্দ জানান, ঐতিহাসিক এ স্থানটিকে পুণ্যভূমি হিসেবে ঘোষণা করা হলে এখানে পর্যটন নগরী গড়ে উঠবে। সারাবিশ্বের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের প্রতি বছর ঢল নামবে এখানে। বাড়বে সরকারের রাজস্বও। তবে বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থা ফেসবুক ও লোক মুখে শুনা যাচ্ছে তাহেরপুর রাজবাড়ির গোবিন্দবাড়ির ভেতর দূর্গা মন্দিরে গত বছর (২০১৮) সালে শারদীয়া দূর্গা পুজার আগে স্থানী সংসদ সদস্য হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সাত্ত্বে পিতৃলের প্রতিমা তৈরী করে এনেছেন ভারত থেকে।

এদিকে,এবার দূর্গা মন্দিরসহ তাহেরপুর পৌরসভায় ১৩টি মন্ডেপে শারদীয় দূর্গা পূজা অনুষ্টিত হবে। এ পুজাকে কেন্দ্র করে প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎ শিল্পীরা। শিল্পীর তুলির রঙয়ের আঁচড়ে মূর্ত হয়ে উঠেছে দেবীর রুপ। অপরদিকে, প্রশাসনের তরফ থেকে জানানো হয়েছে এবার শারদীয়া দূর্গোৎসব উপলক্ষে প্রতিটি মন্দিরে কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছাড়া সার্বোক্ষনিক নিরাপত্তায় থাকবে আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যের পাশাপাশি ৪১২ জন আনসার ভিডিপির সদস্যগণ।

Print Friendly, PDF & Email

Please Share This Post in Your Social Media


কপিরাইটঃ ২০১৬ দৈনিক অন্যদিগন্ত এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Design & Developed BY Seskhobor.Com
Shares
CrestaProject