'ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই' শ্লোগানে ১৬ বছরেও থেমে নেই শফিকুলের লড়াই | অন্যদিগন্ত

শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ০৬:১২ পূর্বাহ্ন

‘ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই’ শ্লোগানে ১৬ বছরেও থেমে নেই শফিকুলের লড়াই

অন্যদিগন্ত প্রতিবেদক ।।

দেশ সেবার শপথ নিয়ে ১৯৯৬ সালে এক তরুণ কনস্টেবল হিসেবে যোগদান করেছিলেন বাংলাদেশ পুলিশে। কিন্তু পুলিশি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ওই তরুণের মনের মধ্যে একটি স্বপ্ন লুকিয়ে রেখেছিলেন তিনি। মনের গভীরে লুকিয়ে রাখা সেই স্বপ্নটির নাম ‘ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ গড়া’। যদিও কলেজে পড়াকালীন বন্ধুদের চক্করে অল্প কিছুদিন নিজেও ধূমপান করা শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু অল্প কিছুদিন যেতে না যেতেই গলা ব্যথা ও কাশি শুরু হয় তার। চিকিৎসকের পরামর্শে ধূমপান ছেড়ে দেন তিনি। এরপর ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলো নিজে অনুধাবন করতে পেরে অন্য মানুষকেও ধূমপান থেকে বিরত রাখবেন বলে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন।

অবশেষে ২০০৩ সালে ‘ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ গড়া’র স্বপ্নটার আত্মপ্রকাশ ঘটিয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুরু করেন ‘ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই’ আন্দোলন। বর্তমানে তার সংগঠনে সদস্য সংখ্যা ৩০ হাজারের ওপরে। সারা দেশের জেলায় ও উপজেলায় রয়েছে কমিটি। শুধুমাত্র দেশে নয়, বিশ্বের ২৪টি দেশেও রয়েছে তার সংগঠনের শাখা। এছাড়াও পুলিশ, শিক্ষক, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পেশার ৩০০ জনের ওপরে বিসিএস কর্মকর্তা তার এই সংগঠনের উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন। ‘ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই’-এর চেয়ারম্যান হিসেবে ফেসবুকে তার ফলোয়ার প্রায় দুই কোটির বেশি মানুষ।

পুলিশের সেই সদস্যের নাম মো. শফিকুল ইসলাম। বর্তমানে তিনি পুলিশের উপপরিদদর্শক (এসআই) পদে ডিএমপির বাড্ডা থানায় কর্মরত আছেন।

পুলিশের চাকরি শুরু করার পর থেকে নিজের দায়িত্ব পালন শেষে যে অবসর সময়টুকু তিনি পান, সেই সময়টুকু রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ফুটপাতের দোকানদারসহ নিম্ন আয়ের নানা মানুষের পেছনে ব্যয় করেন। প্রথম দিকে এসব নিম্ন আয়ের মানুষদের কাছেই ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে আলোচনা করতেন তিনি। পরে ধীরে ধীরে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পৌঁছে গেছেন শফিকুল। এমনকি কর্তব্যরত অবস্থাতেও সুযোগ পেলেই ধূমপায়ী মানুষের কাছে গিয়ে তাদের নানাভাবে বোঝান।

শফিকুলের ভাষ্য, তার এমন ব্যতিক্রম কার্যক্রম দেখে প্রথম দিকে অনেকে তাকে পাগল পুলিশ বলে ডাকত। কোনো চায়ের দোকানে, সিগারেট খাওয়া হচ্ছে এমন জায়গায় গেলে যারা তাকে চিনত তারা বলত, ‘এই পাগল পুলিশ আইছে।’ তবে সেসব কথায় কোনোদিনই বিরক্ত হননি শফিকুল।

‘ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই’ আন্দোলনের চেয়ারম্যান এসআই শফিকুল ইসলাম সম্প্রতি দৈনিক অন্যদিগন্ত’র  কাছে সংগঠনের নানা দিক ও তার চলামান জীবন যুদ্ধের নানা অধ্যায়ের বর্ণনা দিয়েছেন। পাঠকদের জন্য সেটি তুলে ধরা হলো।

কে এই শফিকুল?

শফিকুলের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার কাদৈর গ্রামে। বাবা তোফাজ্জল হোসেন ও মা মহারানী বেগম— দুজনই পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে শফিকুল তৃতীয়। ১৯৯৬ সালের ১ মার্চ চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) একজন কনস্টেবল হিসেবে যোগদান করেন। এরপর চাকরির পাশাপাশি রাজধানীর সরকারি কবি নজরুল কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে ঢাকা মহানগর পুলিশের বাড্ডা থানায় পুলিশের উপপরিদদর্শক (এসআই) পদে কর্মরত আছেন। তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে। মেয়েদের একজন শহীদ আনোয়ারা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছেন এবং অন্যজন দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে। আর একমাত্র ছেলের বয়স সাড়ে তিন বছর। ঢাকার উত্তরার পুলিশ অফিসার্স কোয়ার্টারে পরিবার নিয়ে থাকেন এসআই শফিকুল।

যে কারণে ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লড়াই

ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলন কী কারণে শুরু করেছিলেন জানতে চাইলে এসআই শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘২০০৩ সাল থেকে আমি এই আন্দোলন শুরু করি, যখন আমি সিএমপিতে ছিলাম। আমিও ধূমপান করতাম। সেটা ১৯৯১ সালের দিকের ঘটনা, তখন আমি কলেজে পড়তাম। তবে চুরি করে, কিংবা বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে খেতাম। আমি নিজে কিনে তেমন একটা খেতাম না। ১৯৯২ সালের দিকে আমার নানা রকম শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয়। গলা ব্যথা, কাশিসহ নানা রকমের সমস্যা অনুভব করে আমি ধূমপানটা ছেড়ে দেই। তখন আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি, যেভাবেই পারি মানুষকে ধূমপান থেকে বিরত রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাব। আর একদিন বাংলাদেশকে ধূমপানমুক্ত দেশ হিসেবে দেখব।’

যে বিশেষ ঘটনা সাহস যুগিয়েছিল

ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলন শুরুর দিকের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শফিকুল বলেন, ‘১৯৯৬ সালে আমি পুলিশের চাকরিতে যোগদান করার পরে থেকেই ভাবতে থাকি কীভাবে মানুষকে ধূমপান থেকে বিরত রাখার কাজটা শুরু করা যায়। কিন্তু শুরু করার সাহস কিংবা অনুপ্রেরণাটা পাচ্ছিলাম না। তবে আমি সিএমপিতে কর্মরত থাকা অবস্থায় ১৯৯৮ সালের দিকে একটি আলোচিত ঘটনা ঘটেছিল।

চট্টগ্রামে রাঙ্গামাটি জেলার তৎকালীন জেলা প্রশাসকের (ডিসি) রুমে এক ব্যক্তি হঠাৎ ঢুকে ডিসি সাহেবকে পিস্তল ঠেকিয়েছিল। তাকে জিম্মি করে ওই ব্যক্তি বলেছিল, ‘আপনি সারা দেশে ধূমপান বন্ধ করার ব্যবস্থা করুন।’ এরপর প্রশাসনের সহযোগিতায় তাকে আটক করা হয় এবং ডিসিকে উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনার পর আমি একটি শিক্ষা পেয়ে গেলাম যে, বাংলাদেশে ধূমপানমুক্ত একটি আন্দোলন করা যায়। তবে সেটা ওই ব্যক্তির মতো কাউকে পিস্তল ঠেকিয়ে বা জিম্মি করে নয়। এরপর আমি সর্বসাধারণ মানুষের কাছে যেতে শুরু করলাম।’

তারাই টার্গেট, যারা সাধারণ এক কনস্টেবলের কথা শুনবে

শুরুর দিকে মানুষের সাড়া পাওয়ার ব্যাপারে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রথম দিকে আমি রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ঠেলাগাড়ির চালক অর্থাৎ নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে যেতাম। যারা আমার মতো একজন কনস্টেবলের কথা শুনতে পারে বা শুনবে। এমন মানুষদেরকেই টার্গেট করে, আমি তাদের বোঝাতাম। তখন অনেকেই আমাকে পাগল বলত, কেউ ছাড়তে চাইত না, অনেকে আবার ছাড়তও। তবে আমি সবার কাছেই রেগুলার যেতাম।’

ধূমপান ছেড়ে দেন, আমার বন্ধু হতে পারবেন

যেভাবে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই’ আন্দোলন। তার বর্ণনা দিয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি সিএমপি থেকে বদলি হয়ে ২০০৪ সালে ঢাকায় র‌্যাবে এসে যোগদান করি। র‌্যাবে আসার পরে আমি উত্তরখান, দক্ষিণখান এলাকায় র‌্যাবের পোশাক পরে গিয়ে অনেক মানুষকে বলতাম ধূমপান ছেড়ে দিতে। তবে আমি কিন্তু কাউকে কোনোদিন জোর করিনি। আমি মানুষকে এমনও বলেছিলাম, ভাই আপনারা যদি ধূমপান ছেড়ে দেন তবে আমি প্রতিদিন আপনার কাছে আসব। আমার একটাই উদ্দেশ্য, আপনারা আমার বন্ধু হবেন। যারা ধূমপান ছেড়ে দেবেন, তারাই আমার বন্ধু হতে পারবেন। তখন অনেকে আমার কথা শুনে ধূমপান ছেড়ে দিত। আর যারা ধূমপান ছেড়ে দিত তখন থেকেই আমি খাতা-কলমে তাদের আমার সদস্য করে নেওয়া শুরু করলাম।’

আমার স্ত্রী এই সংগঠনের প্রথম সদস্য

শফিকুল ইসলাম সংগঠনের সদস্য শুরুর বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘ওই সময়ই অর্থাৎ ২০০৪ সালেই আমি আমার সংগঠনের নাম দিলাম “ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই।” আমি আমার একটা ব্যক্তিগত ডায়েরিতে সদস্যদের নাম লেখা শুরু করলাম। আমার স্ত্রী হলো এই সংগঠনের প্রথম বা এক নম্বর সদস্য। তাকে দিয়েই শুরু করলাম। আমি হলাম এর চেয়ারম্যান। প্রথমে আমি চাকরির ফাঁকে বিভিন্ন স্কুলে যেতাম। সেখানে গিয়ে আমি ছাত্রছাত্রীদের বোঝাতাম। কারণ আমি একসময়ে ছাত্র জীবনে স্কুলে শিক্ষকতা করতাম। এর জন্য বিষয়টি আমার কাছে কিছুটা সহজ ছিল।

তিনি বলেন, ‘আমি ছাত্র-ছাত্রীদের বলতাম, ছোট ভাই, তোমরা এটা খাইও না। এভাবে আমি এই পর্যন্ত প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক সেমিনার করেছি। এরপর আমি যখন এটা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করলাম। তখন আমি আমার র‌্যাবের সিনিয়র অফিসারদের কাছে ধীরে ধীরে যেতে শুরু করলাম। এভাবেই যখন র‌্যাব থেকে আবারও পুলিশের ফেরত এসেছি। দেশের বিভিন্ন থানায় ডিউটি করেছি। তাই যখন যেখানে যেতাম; তখন সেখানেই আমার কাজ আমি চালিয়ে যেতাম। আর এভাবেই আমার সংগঠনের বর্তমান সদস্য ৩০ হাজারের ওপরে। সারা দেশের প্রায় সকল জেলা-উপজেলায় আমার কমিটি দেওয়া আছে। তারা সকলেই নিজের মত করে এই কাজ করে যাচ্ছে। আমি মাঝেমধ্যে শুধু তাদের সঙ্গে বিভিন্ন সেমিনারে যোগদান করি। ’

জীবনযুদ্ধের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকেই সমাজ ও দেশকে ধুমপামুক্ত করতে ১৬ বছর ধরে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এসআই শফিকুল ইসলাম। তার এই জীবন যুদ্ধের বাকি অংশ প্রকাশ করা হবে দ্বিতীয় পর্বে।

Print Friendly, PDF & Email

Please Share This Post in Your Social Media


কপিরাইটঃ ২০১৬ দৈনিক অন্যদিগন্ত এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Design & Developed BY Seskhobor.Com
Shares
CrestaProject