শাড়ি বাঙ্গালী নারীর পরিচয় | অন্যদিগন্ত

রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৭:০৬ পূর্বাহ্ন

শাড়ি বাঙ্গালী নারীর পরিচয়

সাহিদা সাম্য লীনা্॥
৩০ আগষ্ট দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি পত্রিকায় অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ শাড়ি নিয়ে একটা রচনা লিখেন, শাড়িকে নানান উপমায় ঢালতে গিয়ে ধানক্ষেত,বাংলার রুপ, প্রকৃতি সব কিছুর সাথে তুলনা করেছেন; কিন্তু তাঁর এই কম্বিনেশনে যুৎসই ভাবে অনেক জায়গায়ই ঘটেনি !
তার মতো ব্যক্তি এমন যৌন আকাঙ্খার আরেক দ্বার খুলে দিবেন কেউ কখনো ভাবেওনি ! যৌনাবেদন লেখা বহু লেখক, কবি ,সাহিত্যিক লিখেছেন । আমরা জানি, তসলিমা নাসরিনের লজ্জা নিয়ে কি ভয়ানক সাইক্লোন বয়ে গেছে দেশে। অবশেষে তিনি দেশ ছাড়া ,এখনও নির্বাসনে!
কথা হচ্ছে তবে সায়ীদ স্যারের শাড়ি নিয়ে এতো সমালোচনা কেন? শাড়ি তো শাড়িই!
কারণ, তিনি শাড়ি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে নারীকে তাতে প্রবেশ করিয়েছেন তাও নগ্ন করে! শাড়ির ভেতর নারীর রুপ, তার দেহের নানা ভাঁজ চিত্রিত করেছেন শাড়ি পরলে নারীর দেহের নানা রহস্য ফুটে ওঠে ,ইত্যাকার তার মনের রস ব্যাকুল করে ঢালতে গিয়ে গোল বাঁধে!
প্রখ্যাত সাংবাদিক পীর হাবিবুর রহমান তাঁর লেখার বিরোধিতা করে বলেছেন অবিলম্বে মাফ চাইতে। তিনি তাঁর লেখায় এমন উপস্থাপন কৌশল শালীন না লাগাতেই বলেছেন, নারী জাতির প্রতি অসন্মাণ চিত্রন তিনি সাপোর্ট করছেন না। আমরা নারীরা এমন আহ্বানে একভাবে গর্বিত ।
এমন পুরুষ হোক নারীকে অপমান তার মনে গিয়ে লাগুক! তাহলে সমাজ থেকে নারীর অবমাননা বিলুপ্ত হতে সহায়ক হবে ।
সায়ীদ স্যার, এমন পড়ন্ত বেলায় এসে তিনি তার এতো জনপ্রিয়তা কে ছোট করে দিলেন । স্যার এই অবস্থান আপনিই ফিরিয়ে আনুন। আপনার আলোকিত মানুষ গড়ার প্রত্যয়ে এতে ভাটাও পড়ে যেতে পারে । উঠতি ছেলেরা ভাববে, স্যার যদি এমন পারেন ,আমরা পারবো না কেন ! চারপাশের অবস্থা এখন অনেকটা অধঃপতনে ! শিশু মেয়েগুলো ধর্ষিত হচ্ছে বড়দের সাথে না পেরে!
যত রহস্য উন্মোচন তত নারীর জন্য রিস্কি! যে পোশাক বাংলাদেশের নারীদের আলাদা পরিচয় বহন করে তাকে খাটো করার পরিকল্পনা টা নিম্ন মানের হয়ে গেল না ! আপনার উচিত ছিল নারী ও পুরুষকে এক পাল্লায় দেখা । কিন্তু ঐ লেখাটি পুরনো ধাঁচের হয়ে গেল । নারীকে নারী রুপে, পুরুষ তা নতুন করে দেখার পথ তৈরি করে দিলেন।
আপনার লেখাটা কোন দারোয়ান, পিয়ন , ড্রাইভার পড়লো! এর পরে, তার সামনে মাঝ বয়সী বা আরো বৃদ্ধ কোন নারী শাড়ি পড়ে হেঁটে গেল, কোন যুবতি,কিশোরী,শিশু পড়লো ,তার ভেতর তখনি আপনার লেখার শব্দ শৈলী গুলো কামভাব তৈরি করে ঐ দৃষ্টি ফলাবে । তার কর্তব্য কাজ ফেলে হয়তো ঐ নারী তাকে তখন গাড়ি বের করতে, গেট খুলতে, বা এমন কোন আদেশ করতে পারে তখন দারোয়ান, পিয়ন, ড্রাইভার অন্যমনষ্ক ! দেখুন পরিস্থিতি কি দাঁড়াবে তখন !
শাড়ি নিয়ে ও শাড়ি পড়লে নারীর শরীর উপলব্ধি হয় ব্যাপারটাতে নতুন ঘি, নতুন দিগন্ত খুলে দিলেন।
আপনি মানুষ গড়ার কারিগর , সুন্দর ¯্রােতের নির্মাতা ! মানুষকে সৃজনশীল ভাবুক, উন্নত মনের বানাতে পোক্ত ব্যক্তিটা ! কী ঢেলে দিলেন বলুন তো ? আপনার কথাশৈলী, প্রতি শব্দ মজা করে বলার ঢং , উচ্চারণ শুনতে বেশ উৎফুল্ল লাগতো ! নতুন উদ্দিপনা জাগতো সামনে এগিয়ে যেতে ! আপনার চেহারা ,পোষাকে একটা ভালো ,ভালো,সঠিক নিপুণতার আর্ট আমরা খুঁজে পেতাম।
স্যার আমার মতো একজন অখ্যাত, মফস্বল হতে আপনার মতো একজন দেশের গুনী আলোর লেখার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে শাড়ি নিয়ে আপনার কিছু কথনের জবাব দিচ্ছি মাত্র!
আপনার মতো বিজ্ঞ জ্ঞানীর ভেতর এতো যৌন রসালো চিন্তা টসটস করছিলো তাও এতো দিনে ঝাঁড়লেন ! আরো আগে ঝাঁড়লে তো এরশাদের মতো হতে পারতেন । এরশাদ লুকোচুরি করেননি বলা যায়; এ নিয়ে ! তিনি প্রেম-ভালবাসা,তার কামুকতা জানাতেন কাজের মধ্যে থেকে তার প্রেমিকাদের । ভীমরতি তার বুড়ো বয়সে না, তরুণ বয়স থেকে তিনি এমনি ছিলেন। এজন্য পাবলিক মজা নিতো। তবে সব নারী মনে কামুকতার আচ্ছাদন করতে তিনি চেষ্টা করেন নি, লিখেন নি নারী জাতকে ছোট করে কোন বাক্য।
স্যার, এতো আলো ছড়ালেন বাংলার বুকে, অথচ আপনার বাত্তির নিচে এতো আঁধার এতো কাম, এতো চাওয়া ,নারী নিয়ে এতো পর্যবেক্ষণের পারঙ্গমতা ,সত্যিই নারী জাত আপনার লেখা পড়ে যার পর নাই বিস্মিত! ধূর , কী বলি আপনার জাত পুরুষও আক্কেল গুড়–ম!
নারীর শরীরের বাঁক আপনি পর্যবেক্ষণ করেছেন,এভাবে আঁকতেন এতোদিন বুজলাম ! আমরা অবাকের সাগরে ভাসছি। একেকজন নারী আপনার লেখার প্রতিবাদে শাড়ির পরনের ইতিহাস তুলে ধরেছেন নিজের। তারা পাত্তা দিয়েছেন বলে কি আপনি একবার ভেবেছেন? তারা ভাল লাগা, মন্দ লাগা সব শাড়িকে নিয়ে গর্ব করছেন বরং। কে কবে প্রথম শাড়ি পড়েছে! কার কতটা শাড়ি তার ওয়ারড্রোব,আলমিরায় সাজানো তা; ফেইসবুকে হুলুস্থুল করে দিয়েছেন নারীরা।
আচ্ছা মিষ্টার সায়ীদ আপনার মা আর স্ত্রী কি শাড়ি পড়ত না? তাদের আপনি কতোটা গভীর থেকে দেখেছেন ? শাড়ির ভাঁজে তাদের শরীরের গোপনীয়তা !
আপনার অগণিত ছাত্রী, শুভাকাঙ্খী, আছে নিকট আত্বীয় !
আপনি সেসব নারীকে সম্পর্কের উর্ধ্বে গিয়ে সুড়সুড়ি উপলব্ধি করে বেশ মজা নিয়েছেন! উঁচু নিচু ভাঁজে ,সৌন্দর্য প্রকাশে, নারীর শরীরের সাইজ সব যে গভীরভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আবিষ্কার করেছেন আপনার লেখাতে তার প্রমাণ পেল নারীরা ।
আচ্ছা স্যার বলেন তো আগে যখন এভাইলেভেল পোষাক ছিল না ,সালোয়ার কামিজ সব বয়সী নারী পড়তো না তখন নারীর জন্য, আপনার স্ত্রী ,মা এর জন্যই বলি শাড়িই তো একমাত্র বস্ত্র ছিল পরিধানের! তাই নয় কি? তাহলে কেন বললেন শাড়ি কে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছে নারী রা! আবার বললেন সুবুদ্ধির পরিচয় দেয় নি! নারী শাড়িকে বিদায় দিবে এ কী করে ভাবলেন? জানেন স্যার শাড়ি পড়া আমাদের বিশেষ দুর্বলতা। শাড়িতে আমরা এক অনবদ্য সুখ খুঁজে পাই।
আপনার মা- স্ত্রীর দিনগুলো শেষ ,তাই কি এমন করে বললেন ! আর কেউ নারী নেই আপনার পরিবারে? তারা কি শাড়ি বিদায় দিয়েছে? মার্কেটে এতো শাড়ি কার জন্য? তাহলে তো মার্কেট থেকেও এতো শাড়ি উধাও হয়ে যেত!
আপনার কাছ থেকে শাড়ি নিয়ে অবাঞ্চিত অশালীন ব্যাখ্যা আশা করিনি । আপনাকে জ্ঞানের হেড কোয়ার্টার জানে হাজার পাবলিক। আলোর দ্বীপ জ্বালিয়ে এখন কোন নৈরাজ্য আপনি দেখাচ্ছেন? কে আপনাকে লেখাটা লিখতে বললো ! আপনার নিজস্ব মতামতে এতো নারীর দেহ নিয়ে বর্ণনাতে না গেলেও হতো ! অন্য ভাবে উপস্থাপন করলে ,শাড়ির ইতিহাস,ঐতিহ্য নিয়ে ব্যাখ্যা করলে কি যে ভালো হতো!
নারীর প্রধান পোষাকের গুন বর্ণনা , যা বাঙালির নারীর একটা অহংকার!
জানেন স্যার, বর্তমানে আমাদের ব্যস্ত জীবনে শাড়ির রোজকার সাথী না হলেও, পরাতে ও সামলানোর ঝক্কি, চলাফেরায় অসুবিধা জনিত কারণে শাড়িকে বেছে না নিলেও এই পোষাকের প্রতি আমাদের জাতের দুর্বার আকর্ষন আছে ! কোন ওকেশনে শাড়ি পড়বো এ নিয়ে বিস্তর কল্পনা ! শাড়ির সাথে নানা রকম ম্যাচিং করে আমাদের রাত-দিন কাটে । পা থেকে মাথা অবধি কেবল ম্যাচিং! কারো কারো শাড়ি বেশ প্রিয়! শাড়ি পরনে আমাদের কোন বদ খেয়াল থাকেনা ।
আমরা নিজেদের নিজের কাছে ভাল লাগছে ,সুন্দর লাগছে এতেই তৃপ্ত ! শাড়ি ছাড়া এখনো আমাদের মা , দাদী , নানিরা কিছু ভাবতে পারেনা। আগের পুরুষরা নারীর পরনে শাড়ি ছাড়া অন্য পোষাক দেখলে আর রক্ষে ছিল না। মারাত্মক এক অপরাধ ছিল বলা যায়। সেসব দিন আপনার মা দাদী,নানি ,চাচীরাও ফেলে আসছে ।
মায়ের আঁচল বলে একটা কথা আছে। আর আঁচলটা কিসের জানেন স্যার? যাকে সাদা পায়রা হয়ে উড়ে যায় বলেছেন তা তো নারীর শাড়িরই! অন্য কোন পোষাকের নয়। মা বলতে,আঁচল বলতে যে ভালবাসা, মমতাবোধ তা ঐ আঁচলই। যে আঁচলের মায়া কোন কিছুতে পরিমাপ সম্ভব না ! শাড়ি নিয়ে নদীর গহীনে না গেলে কি আপনার ক্ষতি হতো? যেখানে শাড়িতে মা কথাটা জড়িয়ে সেখানে নগ্নতা লজ্জার স্যার!
বাঙালি নারীর উচ্চতা কিন্তু বরাবরই মাঝারি গোছের আর এটাই আসল সৌন্দর্য! পাহাড় সদৃশ নারী হলে পাহাড় সদৃশ পুরুষও হতে হতো ! এতো লম্বা নারী কি ভালো লাগতো তখন এই আবহাওয়ায়? আপনার থেকে আপনার স্ত্রী লম্বা ব্যাপারটা হাস্যকর! আর শাড়ি নারীকে লম্বা বানাবে ব্যাপারটা যৌক্তিক না। একেকটা পোষাকের প্রতি মানুষের লুকটা চেঞ্জ হয় ,এটাই ব্যবধান। বাঙ্গালী নারী পশ্চিমা পোশাক পড়ে তাদের মতো ভাবে এতেও আপনি সেখানে ব্যঙ্গ করেছেন। বিদেশীরা আমাদের শাড়ি পড়ে বেশ এক্সাইটেড হয়। হয়তো আমরাও তাদের পোষাকে ওমন কিছু ভাবি!
আপনারা লুঙ্গি পড়েন নিচে , আপনাদের পুরষত্বও নিয়ে কোন দিন, কোন নারী অশালীন কিছু ভাবেনি । লুঙ্গি দিয়ে আপনারা কতো কি করেন ! আরামের খাতিরে! গোছ মারা, নিচে বাতাস লাগানো, ছোট করে,বড় করে পরা, গোসলে, ঘুমাতে কতো ভাবে !
উপরে কিছু না পড়লেও আপনারা স্বাচ্ছন্দে থাকেন । বাঙ্গালীর দুটো পোষাক নারীর জন্য শাড়ি আর পুরুষের জন্য লুঙ্গি ! লুঙ্গিকে তো পুরুষ ঝেঁটিয়ে বিদায় করেনি। শাড়িও করেনি। করবেও না কোনদিন। কাজের জন্য এ পোষাকটা বিপদজনক ! তাই বাইরে এটি পড়া হয় না।
আপনার মতো লোক বাঙ্গালীর ইতিহাস, ঐতিহ্য অস্বীকার করবে এখনো কেন জানি দুঃস্বপ্ন লাগছে!
আপনার রচনা পড়ে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা হাসছে! ফেইসবুকে তুফান বইছে, কিশোর ছেলেমেয়েরাও তা দেখছে সামাজিক মাধ্যমে। আরে স্যারকে নিয়ে কি লিখছে অমুক আন্টি ? সার্চ করে গুগলে, উৎসাহ নিয়ে আপনার লেখা পড়ে মুচকি হাসছে! বন্ধুর কানে কানে বলছে!
তাদের মা খালার বয়সীরা তাদের সামনে শাড়ি পড়লে এখন স্বস্তি পাবে না নিশ্চিত। আপনি সে কুরুচি ভাবনা তাদের ভেতর দিয়ে দিয়েছেন । আপনার ফলোয়ার তারা,আপনাকে ফলো করেছে, করবে এই তো আপনি চেয়েছেন?
এখন এই এটম বোমাটা ফাটানোর প্রতিক্রিয়া আপনি সাফ করুন । আপনার সিদ্ধান্ত!

লেখক॥
সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
সম্পাদক আঁচল
ফেনী সদর প্রতিনিধি, দৈনিক বাংলাদেশের খবর।

Print Friendly, PDF & Email

Please Share This Post in Your Social Media


কপিরাইটঃ ২০১৬ দৈনিক অন্যদিগন্ত এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Design & Developed BY Seskhobor.Com
Shares
CrestaProject