জীবন চলার পথ নিদের্শক একজন শিক্ষক | অন্যদিগন্ত

শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ০৬:০৩ পূর্বাহ্ন

জীবন চলার পথ নিদের্শক একজন শিক্ষক

সাহিদা সাম্য লীনা ॥
শিক্ষক শব্দটি শুনলেই কেমন যেন এক ধরনের শ্রদ্ধায় মন ভরে উঠে। মনের মধ্যে ভেসে উঠে শ্রদ্ধায় ,ভালবাসায় শিক্ষকের পবিত্র মুখটি। একসময় এই শিক্ষক এর প্রতিশব্দ ছিল ওস্তাদ,পন্ডিত মশাই,গুরু। কালক্রমে শিক্ষক বলা প্রচলিত হয়ে পড়ে। যিনি শিক্ষা দেন তিনিই তো শিক্ষক! সবার জীবনে শিক্ষকের ভূমিকা রয়েছেই। স্কুল -কলেজ জীবন শিক্ষকের একচেটিয়া আধিপত্য থাকে। একজন ছাত্রছাত্রীর উপর। স্কুলে বেশী থাকে এর প্রভাব। কলেজে একটু কমে শিক্ষকের দায়িত্ব। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অনেকটাই হ্রাস পায় এই দায়িত্ব ।তবে শিক্ষকের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পায় না শিক্ষার শেষ পর্যায় পর্যন্ত। আমরা অনেকেই ছেলেবেলায় ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ কবিতাটি পড়েছি। এ থেকে জেনেছি শিক্ষকের গুরুত্ব কতোটুকু!
শিক্ষকের অবদান ভোলার নয়। কিন্তু অনেকে, ভুলে যায়। ছাত্র যে কোন কাজে সাফল্য পেলে পরবর্তীতে স্থির লক্ষ্য নির্বাচনেও শিক্ষক সহায়ক হন। সর্বোপরী ,একজন ভাল মানুষ হিসেবে তিনি তার ছাত্রকে গড়ে তোলেন। কোন শিক্ষকই নেই যে, তার ছাত্রের কল্যাণ ছাড়া অকল্যাণ চেয়েছেন!
এমন অনেক শিক্ষক আছেন যারা নীরবে নিভৃতে কেবল দিয়ে গেছেন। অর্থাভাবে অনেক শিক্ষক অন্তরালে হারিয়েছেন বহু আগে। পৃথিবীর সব শিক্ষকের কাজ,দায়িত্ব যদিও একি রকম। তবে, শিক্ষা দানে ব্যবধান আছেই। কেউ ভাল শিক্ষক, খারাপ শিক্ষক, মোটামুটিমানেরও শিক্ষক হবেন এটাই স্বাভাবিক।
৫০/৬০ দশকে যেমন শিক্ষক ছিল, ৭০/৮০ দশকেও সে আদর্শ ধরে রেখেছিলেন। ৯০ দশক থেকে পরিবর্তন সূচিত হয় শিক্ষকের আচার আচরণে। মর্ডান হয়ে পড়েন তারা। এখন অনেক শিক্ষকের সাথে অনেক ছাত্রের বন্ধুত্ব । কে শিক্ষক, কে ছাত্র নির্ণয় অসম্ভব।
অপরদিকে, শিক্ষকের অক্ষুন্ন মর্যাদা নষ্ট করে ফেলেন বিংশ শতক থেকে। বেরিয়ে আসে শিক্ষকের লোম হর্ষক চেহারা ও চরিত্র বিভিন্ন স্কুল-কলেজ , মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় হতে। ধর্ষণ ,বলাৎকারের মতো নিচু ও অবৈধ কাজে নেশাগ্রস্ত এখন অনেক শিক্ষক। সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া আলোচিত ঘটনাগুলো কোন না কোন শিক্ষকের।
এরপর শিক্ষার গুণগত মান, শিক্ষকের শিক্ষা দানের ব্যর্থতা,অদক্ষতা তো রয়েছেই। নানা সমস্যা এই শিক্ষাখাতে বিদ্যমান। শিক্ষকরা এখন অনেক কর্পোরেট, বাণিজ্যের মতো। টাকা কামানোর ধান্দায় অনেক শিক্ষক নিয়োজিত। বাড়ি ,গাড়ি আছে অনেক শিক্ষকের। তদন্তে স্কুল প্রধান শিক্ষকদের নৈরাজ্যতা বেরিয়ে আসবে। এক স্কুলে বছরের পর বছর প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে বসা খুঁজলেই পাওয়া যাবে। বদলী ঠেকিয়ে থাকে বিশেষ ব্যক্তির মাধ্যমে। অবশ্য এখানেও অর্থ লেনদেন থাকে। এই লেনদেনের অংক আসে অসাধু কাজ থেকে।
যতই শিক্ষক নিয়ে সমালোচনা হোক তথাপিও শিক্ষকের মান ও চাহিদা যুগ যুগ অবিচল থাকবে। শিক্ষক দিবস সার্থক হবে এভাবেই। একজন শিক্ষকেই যথেষ্ট একজন ছাত্রের জীবনে।
শিক্ষকের অবদানকে মূল্যায়ণের জন্য ১৯৯৫ সালে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। বিশ্বব্যাপি শিক্ষক সংগঠন এই দিবসটি পালন করে থাকে। ইউনেস্কোর মতে, বিশ্ব শিক্ষক দিবস শিক্ষা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ পালন করা হয়। ৪০১ টি সহযোগী সদস্য সংগঠন ও এডুকেশনাল ইন্টারন্যাশনালে ইআইর মূল ভূমিকায় বিশ্বের ১০০টি দেশ এই দিবসটি উদযাপন করে র‌্যালি ও আলোচনা সভার মাধ্যমে। প্রতিবছর দিবসে একটি প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারিত হয় যাতে জনসচেতনতা তৈরি হয়।
কোন, কোন দেশে ভিন্ন ভিন্ন তারিখে দিনটি পালিত হলেও ইউনেস্কোর মতে ৫ অক্টোবরই স্বীকৃত।
এদিনে শিক্ষকদের নিজ, নিজ জায়গা হতে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য সন্মাননাও দেয়া হয়।
একজন মানুষের গোটা জীবনের সফলতার পিছনেও শিক্ষকের অবদান স্বীকার্য। তাই, কেবল লেখাপড়ার ক্ষেত্রে নয়; জীবন চলার পথ নিদের্শক একজন শিক্ষক ।
এরিষ্টোটলের মতে,যারা শিুশুদের শিক্ষাদানে ব্রতী তারা অভিভাবকদের থেকেও অধিক সন্মানীয়। পিতামাতা জীবন দান করেন ঠিকই। শিক্ষকরা সেই জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেন।
পৃথিবীতে জন্মের পর তিনজন মানুষের অবস্থান পরিষ্কার। বাবা মা ও শিক্ষক। শিশুর প্রাথমিক এক পাঠ হয় বাবা-মার কাছে। এরপরেই শিক্ষকের দারস্থ হতে হয়। জীবনের মোড় ও সুবিধা অসুবিধা সব শিক্ষকেই জানাতে পারেন; ছাত্রের মনোভাবও চাহিদা বুঝে। বড় মনীষিদের ইতিহাস দেখলে জানা যায়, তাদের জীবনে শিক্ষকের অবদান ও তাদের গঠনের দিকপাল।
এ পি জে, আবদুল কালাম বলেছেন যদি একটি দেশকে দুর্নীতিমুক্ত এবং সুন্দর মনের মানুষের জাতি হতে হয় তাহলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসকরি, এ ক্ষেত্রে তিন জন সামাজিক সদস্য পার্থক্য এনে দিতে পারে। তারা হলেন বাবা,মা এবং শিক্ষক।

লেখক- গণমাধ্যমকর্মী ও সাহিত্যিক
ফেনী।

 

Print Friendly, PDF & Email

Please Share This Post in Your Social Media


কপিরাইটঃ ২০১৬ দৈনিক অন্যদিগন্ত এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Design & Developed BY Seskhobor.Com
Shares
CrestaProject