ভ্রান্ত ধারণা | অন্যদিগন্ত

শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ০৬:০৭ পূর্বাহ্ন

ভ্রান্ত ধারণা

নার্গিস আখতার ক্ণক ॥
ইন্ট্ররন ডাক্তার,উত্তরা উইমেন্স মেডিকেল কলেজ এন্ড হসপিটাল

ঘড়িতে রাত ৯ টা বাজে।আমার যাবার সময়ও হয়ে গেছে।আজ শুক্রবার বলে অন্যদিনের থেকে রোগীর চাপ বেশি ছিল। তাই রোগীর পর্ব শেষ করে ক্লান্ত শরীরে চেয়ারে হেলান দিয়ে ঝিমুচ্ছি। হঠাৎ অভ্রর ফোন আসলো।

অভ্র আর রুপা আমার খুব কাছের দুই বন্ধু। স্কুল –কলেজ একসাথে পাশ করার পর, আমি চলে আসি ঢাকা মেডিকেলে কলেজে আর অভ্র, রুপা ঢাকা ভার্সিটিরর আই. বি. এ তে ভর্তি হয়। বন্ধুত্বের টানে প্রায় ওদের সাথে টি. এস. সি তে বসে আড্ডা দিতাম।এদিকে ভার্সিটিতে গিয়ে অভ্র আর রুপার মধ্যে প্রেম শুরু হয়। দুইজনেই ছিল আই বি এর তুখোড় শিক্ষার্থী । পাশ করে অভ্র বিসিএস ক্যাডার হয়ে যায়।কিন্তু রুপার বিসিএস না হলেও একটা বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে অনেক টাকা বেতনের চাকরি হয়।এর কিছুদিনের মধ্যেই তাদের বিয়ে হয়ে যায়।

অনেক ব্যাস্ততার কারণে অনেকদিন আমাদের দেখা সাক্ষাৎ না হলেও ফোনে প্রায় যোগাযোগ হত। কিন্তু শেষ সাত মাস আমি বিদেশে থাকায় কোন যোগাযোগ ছিল না।

দেশে এসেছি এক মাস হলো, কিন্তু এখনো যোগাযোগ করা হয়নি।তাই খুব ভয়ে ভয়ে ফোন ধরলাম আমি।ভেবেছিলাম ফোন ধরেই গালিগালাজ করবে।কিন্ত না,অভ্রর কথায় দুশ্চিন্তার ছাপ।
কিরে এত গোমড়া হয়ে কথা বলছিস কেন,ভেবেছিলাম গালিগালাজ করবি।
— না রে,আজ না,গালিটা তোর পাওনা থাকলো।তুই কি এখন চেম্বারে? ফ্রী আছিস?
—কেন চেম্বারে এসে গালি দিতে চাস?তবে চেম্বার শেষ করলাম,যাব যাব করছি।
—প্লিজ কষ্ট করে দশ মিনিট বস। আমি এখনি আসছি।কথা আছে।

ফোন রেখে তখনও আমি গালি খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। সাত মাস পরে দেশে এসেও যোগাযোগ করিনি। স্পেশাল গালি যে খাব এটা নিশ্চিত আমি। বেল টিপে মিজানকে কড়া করে দুইটা চা দিতে বললাম।

অভ্রর অপেক্ষা করতে করতে ঝিমুনি কাটানোর জন্য চায়ে চুমুক দিলাম।অমনি অভ্র এসে হাজির। চুলগুলো উসকো খুসকো,মুখে দাড়িগুলো অযতেœ গজিয়েছে। রুমে ঢুকে খুব কষ্ট করে একটা হাসি দিল।

আমি তাকে বসতে বলেই পানির গ্লাস এগিয়ে দিলাম। তখনও বুঝে উঠতে পারছি না,অভ্রকে এমন দেখাচ্ছে কেন। রুপার কথা জিজ্ঞেস করাতে মুখটা বিষণ্ণ হয়ে গেল।
কিভাবে যে তোকে বলি
—আমার কাছে লুকানোর কি আছে বলে ফেল।

অভ্র ইতস্ততভাবে বলল, রুপার উপর একটা খারাপ জ্বীন ভর করেছে।
এমন একটা কথা শুনার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না।বেশ হকচকিয়ে বসলাম।যদিও এখন জ্বীন-ভূত বিশ্বাস অবিশ্বাস নিয়ে অনেক বাকবিতান্ডা আছে।তবুও, জ্বীন যে আছে সেটা আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি।
— কিভাবে বুঝলি রুপাকে জ্বীনে ধরেছে তুই একটু খুলে বলবি?
অভ্র বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল।
তুই তখন দেশে ছিলিন না। তোকে জানানোর অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু বারবারই ফোন বন্ধ পেতাম।
—সেই জন্য আমি দুঃখিত। হঠাৎ করে চলে যেতে হয়,বিধায় জানানোর সময় পাইনি।তারপর বল।
তারপর,জানিসতো,রুপা একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করে বিধায়,অনেক কাজের চাপে থাকে।আমিও ব্যাস্থ থাকি। দুজন দুজনকে সময় দিতে পারি না। এই নিয়ে প্রায় রুপার মন খারাপ থাকত। অনেক দিন আব্বা আম্মাকেও দেখিনি।তাই দুইজনে ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে আত্তীয় স্বজনদের সাথে সময় কাটানোর জন্য গ্রামে গেছিলাম।
কিন্তু সেই যাওয়া যে কাল হয়ে দাঁড়াবে ভাবিনি।

অভ্রর কথা শুনে আমার ঝিমুনি পুরোই কেটে গেছে কিন্তু,চায়ের নেশা বাড়লো।তাই মিজানকে ডেকে আরো দুই কাপ চা দিতে বললাম।
এরপর,কি হলো বল?
আমাদের এলাকায় এখনও কারেণ্ট যায়নি। সোলারে চলে। দিনের আলো নিভে এলে,কোন কোন বাড়িতে সোলার লাইট জ্বলে, কোন কোন বাড়িতে হাড়িকেনের আলো।

সেইদিন ছিল জ্যোৎসনা রাত।কেন যেন সন্ধ্যার পরে নদীর ধারে যেতে মন চাইলো। রুপাকে নিয়ে,জ্যোৎসনার আলোয় বাড়ির পিছনের বাঁশ বাগান পেরিয়ে নদীর ধারে গেছিলাম।
—সেইদিন রাতেই কি রুপা অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করেছিল?
—না।সেই দিন রুপার মন খুব উৎফুল্ল ছিল। সবার সাথে হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় কথা বলতো,মায়ের বারণ সত্বেও, রান্না করে খাওয়াতে পছন্দ করতো।এইরকম,সাত—আট দিন ভালোই যাচ্ছিলো।প্রায় রাতে আমাকে ঘুম থেকে তুলে গল্প করতে চাইতো।মনে হতো ষোলো বছরের বালিকা আমার সামনে বসে আছে। রুপাকে এত হাসি খুশি দেখে খুব ভালো লাগছিলো।

কিন্তু ঢাকা আসার চার পাঁচ দিন আগে থেকে হঠাৎ অসাভাবিক আচরণ শুরু করে,কোন কারণ ছাড়াই।
কিন্তু,অভ্র রুপার চার পাচদিন আগের আচরণও আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।
—কি বলিস,রুপা তখন অনেক হাসি খুশি ছিল।
—যায় হউক,তোর কথা শেষ কর।
—কেমন অস্বাভাবিক আচরণ?

এই ধর,সামান্য কথায় হঠাৎ রেগে যায়,খারাপ ব্যবহার করে,রাতে অস্থির থাকে ঘুমায় না,হঠাৎ হঠাৎ কান্না করে।আরও শুনলে অবাক হোবি,এক দিন আম্মাকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিয়েছিল।
আচ্ছা আমার একটা প্রশ্ন আছে,জ্বীন যদি হয়ে থাকে, তাহলে সেই জ্যোসনা রাতে ভর না করে সাত আট দিন পরে ভর করলো কেন?
—তা ঠিক,কিন্তু, তুইতো জানিস,আম্মা গ্রামের মানুষ,উনি একজন কবিরাজ ডেকে এনেছিল। কবিরাজ বলেছে,জ্বীন এত সুন্দরী মেয়ে দেখে প্রেমে পরে।কিন্তু—
—কিন্তু কি?
রুপা থাকে ঢাকাতে, সে গ্রাম ছেড়ে রুপার সাথে শহরে আসবে কিনা সেটা ভাবতে সাত আটদিন সময় নিয়েছে।
তাহলে বলছিস, জ্বীন এখন রুপার সাথে ঢাকা শহরে এসেছে?
—অভ্র মাথা নিচু করে বলল,হ্যাঁ এসেছে। জানি তুই ডাক্তার মানুষ এসবে এখন তোর বিশ্বাস নাই। কিন্তু জ্বীন যে ভর করেছে এতে কোন সন্দেহ নাই।
— তাহলে আমার কাছে এসছিস কেন?
—তোর কাছে কোন জিনিসটা লুকাই বল।

ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি রাত ১১.৩০। আমি যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালাম।
অভ্র— চল,তোকে পৌছে দিয়ে আসি।অনেক রাত করে দিলাম তোর।
—হুম চল।
তবে একটা কথা,তোদের নানা বাড়ির গ্রামের যে একটা বড় কবিরাজ ছিলো তার ঠিকানা যোগাড় করে দিবি। রুপাকে যে জ্বীনে ধরেছে এট নিশ্চিত।
অভ্রর কথা শুনে আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।আমি কোন উত্তর করলাম না।
আজ নিলয় নাই।অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে গেছে।একা ঘরে আমার কেমন যেন ভয় ভয় করছে।বুঝলাম আজ আর ঘুম হবে না।
আমি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। কিন্তু সাইকিয়াট্রি বিষয়ে আমার খুব ইন্টারেস্ট কাজ করে।হঠাৎ মাথায় আসলো,রুপার মানুষিক সমস্যা হয়নিত।
টেবিলে বসে সাইকিয়াট্রি বিষয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম।মনে হচ্ছে রুপার রোগটা বাইপোরলার ডিজঅর্ডার।নিশ্চিত হোয়ার জন্য আমার মেডিকেলের বন্ধু ফরহাদকে ফোন দিলাম।

ফরহাদ একজন বড় সাইকিয়াট্রিস্ট।সে একজন চমৎকার মানুষ। দারুনভাবে রোগীকে কাউন্সেলিং করে।তার উপর আমার পুরো বিশ্বাস আছে। সেই পারবে রুপাকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে।

এদিকে অভ্র মানতেই নারাজ,রুপার কোন মানুষিক রোগ হতে পারে।যে মানুষটা এত বছর সুস্থ ছিল।এই এক মাসের মধ্যে মানুষিক রোগ ধরা পরবে এটা অসম্ভব।

আমিও কখনো ভাবিনি, রুপার মধ্যে যে বাইপোলার ডিজর্ডার জীন লুকিয়ে আছে।কি করব ভেবে পাচ্ছি না।শুধু জানি,বন্ধু হিসেবে আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেই হবে।

খোজ নিয়ে জানলাম,রুপার এক চাচা মানুষিক রোগে আক্রান্ত হয়ে আত্মহত্যা করে । সেই জীন রুপার মধ্যেও এসেছে।কারো ছোটতে আবার কারো বড় হয়ে বিকাশ ঘটে। যখনি চারপাশের পরিবেশ তাদের প্রতিকূলে যায়, মানুষিক চাপ তৈরী করে। তখনই সুপ্ত জীনের বিকাশ ঘটে।কখনো জীনগত কারণে হয়,কখনো পরিবেশের জন্য।

এতদিন পরে রুপার সাথে দেখা হলো আমার। কিন্তু অনেক খারাপ ব্যবহার করলো,খুব বিরক্ত হলো,আমাকে এই মুহূর্তে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে বলল। জানি,সে এখন অসুস্থ, তারপরও কেন জানি, বার বার চোখ বেয়ে পানি নেমে আসলো।

Print Friendly, PDF & Email

Please Share This Post in Your Social Media


কপিরাইটঃ ২০১৬ দৈনিক অন্যদিগন্ত এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Design & Developed BY Seskhobor.Com
Shares
CrestaProject