দুর্নীতি ও নৈতিক স্খলন রোধে আসকু'র নীতি বড় ভূমিকা রাখতে পারে | অন্যদিগন্ত

সোমবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:২৬ পূর্বাহ্ন

দুর্নীতি ও নৈতিক স্খলন রোধে আসকু’র নীতি বড় ভূমিকা রাখতে পারে

এম. এ. আলিম খান:
বর্তমান সময়ে অন্যতম আলোচিত খবর হল আইসিসির অ্যান্টিকরাপশন অ্যান্ড সিকিউরিটি ইউনিট (আকসু) বিশে^র সেরা অলরাউন্ডার ও বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক বাংলাদেশের গর্ব সাকিব আল হাসানকে এক বছরের জন্য সব ধরনের ক্রিকেটে নিষিদ্ধ করেছে। এটি মেনে নিতে পারছি না। শাস্তিটা ৬মাস হলে যুক্তিসঙ্গত হতো। কোন বড় ধরনের অন্যায় না করে অনেক বড় শাস্তি পেতে হচ্ছে সাকিব আল হাসানকে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। আমরা আর কোন দিন এই সাকিবকে পাব কি না তা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানেন। তবে সাবিক আল হাসান বাংলাদেশের মানুষের যে ভালবাসা পেয়েছেন তাতে আমরা আশাবাদী তিনি নতুন উদ্যোমে আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন।
১৯৯৯ সালের বিশ^কাপ ক্রিকেটের পর একের পর এক ম্যাচ পাতানোর তথ্য বেরিয়ে আসতে থাকে। যেখানে অনেক বড় বড় ক্রিকেটারের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। অনেকেই প্রশ্ন তুলতে থাকেন, ‘আমরা কি টাকা দিয়ে খেলার মাঠে নাটক দেখতে যায়? ভদ্র লোকের খেলা বলে পরিচিত ক্রিকেট সাংঘাতিকভাবে ভাবমূর্তি সংকটে পড়ে। এরই পটভূমিতে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত কমিশনার লর্ড কন্ডনের নেতৃত্বে ২০০০ সালে আইসিসি একটি অ্যান্টিকরাপশন ইউনিট গঠন করে। ২০০০ সালেই অ্যান্টিকরাপশন ইউনিটের রিপোর্টের সূত্র ধরে ভারতের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আজহার উদ্দিনকে ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ড বা বোর্ড অব কন্টোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া (বিসিসিআই) আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করে। মোহাম্মদ আজহার উদ্দিন ভারতের হয়ে ৯৯টি টেস্ট এবং ৩৩৪টি এক দিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। ২০০৬ সালে ভারতের আদালত মোহাম্মদ আজহার উদ্দিনের বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ খারিজ করে দেন এবং তার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। ২০০৩ সালে অ্যান্টিকরাপশন ইউনিটের নাম বদলে রাখা হয় অ্যান্টিকরাপশন অ্যান্ড সিকিউরিটি ইউনিট (আকসু)। আকসু এখন আইসিসি’র যেকোন আয়োজনে নজরদারি করে এবং কীভাবে ক্রিকেটারদেরকে অন্ধকার জগতে পা বাড়াতে প্রলুব্ধ করা হয় সে সম্পর্কে ক্রিকেটারদেরকে সচেতন করে থাকে।
বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ তৃতীয় বার ক্ষমতায় এসে দলটির সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেকটা দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। ইতোমধ্যে আমরা তার নমুনা দেখতে পেয়েছি। যেহেতু দলটি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় আছে তাই দলের মধ্যে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতিবাজদের জন্ম হবেই এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা যেন মাত্রাতিরিক্ত না হয়; হলেই দলের জন্য তা বিপদ ডেকে আনবে। বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরে অত্যন্ত দূরদর্শী, প্রজ্ঞাবান ও বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির লাগাম টানতে শুরু করেছেন। ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবকলীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের শাস্তি দিয়েছেন; যেটা লোকে আগে কল্পনাও করতে পারেনি। অনেক নেতা কর্মী, পুলিশ প্রশাসনের লোকজন ভেবেছিলেন আমরা সরকারকে তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসতে সহযোগিতা করেছি বা আমরাই ক্ষমতায় এনেছি এখন যা খুশি তাই করতে পারি! সরকারের এই দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে তাদের সেই আশার গুড়ে বালি।
অনেকেই লাগামহীন দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে। নিজেদেরকে অনেক কিছু ভাবতে শুরু করেছে। সম্প্রতি কমিউনিটি পুলিশিং ডে -২০১৯ উপলক্ষ্যে রাজারবাগ পুলিশ অডিটোরিয়ামে এক অনুষ্ঠানে ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কিছু পুলিশ অফিসারদের ভাব এরকম যে তারা বাদশা, আর জনগণ তাদের প্রজা’। ডিএমপি কমিশনার শুধু বলেই ক্ষান্ত হয়নি, কয়েকদিনের মধ্যে বেশ কয়েকজন অফিসারকে বদলিও করেছেন। সুতরাং এ থেকে বুঝা যায় সরকারের সব সেক্টরে একে একে শুরু হবে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান। তা সে রাজনীতিবিদ হোক আর সরকারি কর্মকতা-কর্মচারী হোক। প্রধানমন্ত্রীও বিষয়টির ঈঙ্গিত দিয়েছেন। গণভবনে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে দুর্নীতিবাজদের প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘অপেক্ষা করেন সব দেখতে পাবেন।’ ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের কয়েকজন কাউন্সিলরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সরকারের পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘দেশব্যাপী শুরু হবে দুর্নীতি বিরোধী শুদ্ধি অভিযান।’
বাস্তবতার আলোকে আমরা দেখেছি সাধারণ মানুষ দুর্নীতি করছে না। দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ বা সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন বা ছিলেন এমন কতিপয় ব্যক্তিই সাধারণত দুর্নীতি করছে। যখন কোন দলীয় নেতা কর্মীর কোন দুর্নীতি ধরা পড়ে তখন দল তার কোন দায় নিতে চায় না! তাই সে যে দলেরই হোক। তার শাস্তি হয় দল থেকে বহিষ্কার। আর কোন সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী হলে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে বদলি করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়। এখানেও দেখা যায় অভিযুক্তের সহকর্মীরাই তদন্ত করেন এবং তদন্ত রিপোর্টে তার সর্বনি¤œ শাস্তি হয় যেটা না দিলেই নয়। কয়েকদিন আগে তার একটা বাস্তব প্রমাণ আমরা পেলাম। ফেনীর বহুল আলোচিত নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকান্ডের রায়ে ১৬জনকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে কিন্তু ওসি মোয়াজ্জেম যিনি যথাযথ ভুমিকা পালন করলে নুসরাতকেও মরতে হতো না আর এতগুলো মানুষের ফাঁসির রায়ও হতো না। আদালত কিন্তু ওসি মোয়াজ্জেমেকে কোন শাস্তি দেয়নি। ওসির থেকে কম অপরাধ করেছে এমন ব্যক্তিরও কিন্তু ফাঁসি হয়েছে। সুতরাং রাষ্ট্রীয় ও দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর আগে তাদের নৈতিকতার পরীক্ষা নিলে সরকার বা দলকে বিব্রত অবস্থার মধ্যে পড়তে হয় না।
আমরা দেখেছি কতিপয় নেতা ধর্ষণের সেঞ্চুরি করেছে এবং সেটা গর্বের সাথে উৎযাপনও করেছে। কয়েকদিন আগে একটি জেলার সর্বোচ্চ সরকারি কর্মকর্তার নারী কেলেঙ্কারী সরকারকে একটি লজ্জাজনক ও বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। এখন আবার দিনাজপুরের ডিসির বিরুদ্ধে একই অভিযোগ উঠেছে। গত বছর নাটোরের এক ডিসি বিরুদ্ধে তার সহকর্মী এক নারী ম্যাজিস্ট্রেট যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছিল। গত বছরের প্রথম দিকে ডিএমপির একজন অতিরিক্ত কমিশনারের বিরুদ্ধেও নারী নির্যাতনের অভিযোগ উঠে। এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ^াসের সংকট তৈরি হয়। যা কোন ভাবেই কাম্য নয়।
আইসিসির অ্যান্টিকরাপশন অ্যান্ড সিকিউরিটি ইউনিট (আকসু) দুর্নীতি রোধে যে নীতি গ্রহণ করে তার কিছুটাও যদি কোন দেশ বাস্তবায়ন করে তাহলে সেই দেশের দুর্নীতি দমন ও নৈতিক স্খলন রোধ হতে বাধ্য। জাতি একটি সুন্দর দুর্নীতিমুক্ত সভ্য উন্নত দেশ দেখতে পাবে।

Print Friendly, PDF & Email

Please Share This Post in Your Social Media


কপিরাইটঃ ২০১৬ দৈনিক অন্যদিগন্ত এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Design & Developed BY Seskhobor.Com
Shares
CrestaProject