প্রিয় ইলিয়াস কাঞ্চন! জাতি হিসেবে আমরা লজ্জিত | অন্যদিগন্ত

সোমবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:২১ পূর্বাহ্ন

প্রিয় ইলিয়াস কাঞ্চন! জাতি হিসেবে আমরা লজ্জিত

সাহেদুল ইসলাম সাগরঃচট্টগ্রাম॥
সন ১৯৯৩ ইংরেজির কথা.সবেমাত্র তিনি শিখলেন বিস্কুট বানানো.ইচ্ছই ছিল সেই শখের বিস্কুট বানিয়ে নিজে প্রিয়তম’কে খাওয়াবেন.ইচ্ছেনুযায়ী সেই নিজ হাতে বানানো বিস্কুট নিয়ে প্রিয়তম স্বামীর কাছে ছুটলেন.স্বামী দেশের জনপ্রিয় অভিনেতা.দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যবসা সফল ছবির নায়ক [ বেদের মেয়ে জোছনা-সেই সময়কার এই ছবি প্রথম ৩ মাসে ইনকাম করেছিল প্রায় চল্লিশ কোটি টাকা,যে সিনেমা হলে গিয়ে দেখার জন্য অন্তত ২ দিন আগে থেকেই টিকিট কেটে রাখতে হতো ] ছবির শুটিং চলছে পার্তব্য জেলা বান্দরবনে.সেখানেই ছুটলেন সেই বিস্কুট নিয়ে.কিন্ত,সেই যাওয়াই শেষ যাওয়া.রোড এক্সিডেন্টে চলে গেলেন জাহানারা কাঞ্চন.প্রিয়তম স্বামী ইলিয়াস কাঞ্চন তখনও স্যুটিং এ.কাজ শেষে হোটেল রুমে ফিরে জানলেন স্ত্রী রোড এক্সিডেন্ট করেছে.তবে তার মৃত্যুর কথা তার নিকট গোপন করা হল.হাসপাতালে গিয়েই জানলেন তার প্রিয়তমা স্ত্রী আর নেই.এরপর ছোট বাচ্চাদুটিকে নিয়ে শুরু হল দেশের জনপ্রিয় নায়কের নতুন জীবন সংগ্রাম.মৃত স্ত্রীর ছবি বুকে নিয়ে ঝাপিয়ে পড়লেন রাজপথে.সেই সংগ্রামে তিনি বিসর্জন দিলেন নিজের সফল ক্যারিয়ার.সিনেমার নায়ক হতে সড়ক পরিবহনের সন্ত্রাসীদের চোখে তিনি এখন ভিলেন.ট্রলের কথা আর নাই’বা বললাম.আছে মৃত্যুর হুমকি.কিন্ত,এতকিছুর পরও নত করেননি শির.গত ২৭টি বছর একা একা চালিয়ে গেছেন নিজের এই সংগ্রাম.বলা চলে ওয়ান ম্যান আর্মি.সংগ্রামের বিবেচ্য বিষয়-একমুখী চলন,ফ্লাইওভার দিয়ে হাটা,জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করা,ফোরলেন,ডিভাইডার,ড্রাইভারদের সচেতনতা,গাড়ির ফিটনেস,হাইওয়ে পুলিশ ও সড়ক পরিবহন আইনের সংশোধন তথা নিরাপদ সড়ক.আমাদের সকলের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই ব্যাপারে তিনি নিজেই একা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন.কিন্ত,তার এই সংগ্রামে তিনি সত্যিই ভীষণ রকমের একা.তাই,তাকে নিয়ে ট্রল করে আমরা মজা নিই.গন পরিবহন আইন সংশোধন হওয়াতে যেন কেবল তার একার’ই লাভ হয়েছে.তাই তো আজ তার ছবির উপর জুতা লাগিয়ে তার মুখে জুতার বাড়ি দেওয়ার আহবান জানানো হচ্ছে.আমরা জাতি হিসেবে সত্যিই বড় অভাগা.নইতো ইলিয়াস কাঞ্চনদের জন্ম অন্য কোন দেশে হলে নির্ঘাত তার জীবন নিয়ে এতদিনে কয়েকজন পরিচালক তার বায়োপিক বানিয়ে ফেলতো.দেশের মানুষ তাকে শ্রদ্ধার চোখে তাকাতো.রাস্ট্রীয়ভাবে তাকে সম্মান জানানো হতে এমন আকাশচুম্বি ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে রাজপথে নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন করার জন্য.কিন্ত,তার কুশপুত্তলিকা দাহ,গালে জুতার বাড়ি দেওয়ার আহবান সম্বলিত পোস্টার,জাতীয় ভিলেন কিংবা মৃত্যুর হুমকি দেওয়া ছাড়া আমরা তাকে আর কোন সম্মান দিতে পারিনি.অবশ্য তিনি কোন সম্মান পাওয়ার লোভে এই আন্দোলন করেননি.বাংলার কোটি মানুষের জীবনের হুমকি ও নিরাপত্তার জন্যই তিনি রাজপথে নেমেছিলেন নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে.করেছেন “নিরাপদ সড়ক চাই” নামীয় সংগঠন.ঘরের খেয়ে পরের মোষ তাড়ানোর মত এই সংগঠের পেছনে তিনি দিয়েছেন নিজের শ্রম,অর্থ.হতে হয়েছে অনেকের চক্ষুশূল,এদেশে ভালো কাজের বিনিময়ে জুটে জুতার বাড়ি একজন ইলিয়াস কাঞ্চনই যেন এর যথার্থ উদাহরণ.অথচ তিনি দিনের পর দিন শুধু ড্রাইভারেদের কাছে গিয়েছেন.বুঝিয়েছেন বেপরোয়া গাড়ী চালানোর ভয়াবহ ফলাফল.রাস্তা ও আইনের সংষ্কার চেয়েছেন.কিন্ত,কি বুঝাল আর কি বুঝলাম.তাই পরিবহন নেতারা বুঝিয়ে দিল এই লোক আইনের সংষ্কার চেয়ে মূলতঃ পরিবহন শ্রমিক তথা ড্রাইভারদের জন্যই কঠোর আইন চান.ব্যাস,সেই থেকেই ইলিয়াস কাঞ্চন যেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের চক্ষুশূল.অথচ তিনি সড়ক দূর্ঘটনার জন্য কেবল ড্রাইভারদের দায়ী করেননি,তিনি সোচ্চার ছিলেন পথচারীদের পারাপার নিয়ে,ফিটনেস বিহীন গাড়ী নিয়ে.হয়তো তার সংগ্রামে সড়কে মানুষ খুন করতে একটু কষ্টে পড়ে গিয়েছিল খুনেদের দল.তাই তো আজ সড়ক জুড়েই টানানো হয়েছে তার ছবি দিয়ে সাথে জুতা লাগিয়ে বিভিন্ন প্রকার কুরুচিপূর্ণ কথা.প্রাণনাশের হুমকি জুটেছে তার কপালে.তার সংগ্রামের ফলাফল হয়তো এটাই আমরা নির্ধারণ করেছি.এটাই ভাল কাজের মূল্যায়ন.জাতি হিসেবে আমরা এতটা নিচ মনমানসিকতার হয়ে পড়েছি যা সত্যিই অবাক করার মত.তাই,ইলিয়াস কাঞ্চনদের আমরা আর কি’বা বলতে পারি,আমরা সত্যিই লজ্জিত প্রিয় ইলিয়াস কাঞ্চন।

Print Friendly, PDF & Email

Please Share This Post in Your Social Media


কপিরাইটঃ ২০১৬ দৈনিক অন্যদিগন্ত এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Design & Developed BY Seskhobor.Com
Shares
CrestaProject